সীতাকুণ্ড গণহত্যা ফিরে দেখা (১৯৫০) সে ইতিহাস পড়ুন।

সীতাকুণ্ড গণহত্যা (১৯৫০) স্মৃতিকথা অনুযায়ী, ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৫০-তে সীতাকুণ্ডে মহা শিবরাত্রির মেলা চলাকালীন হিন্দু তীর্থযাত্রীদের ওপর সহিংসতা সংঘটিত হয়েছিল, যা ইতিহাসে সীতাকুণ্ড হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত। এই ঘটনায় বহু লোক নিহত ও আহত হয় এবং অনেকেই বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন। ইতিহাসের পাতা হতে খুঁজে পাওয়া রক্তাক্ত সেই ইতিহাস।

সীতাকুণ্ড গণহত্যা ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারি–মার্চে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)-এ সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার একটি অংশ। এটি বৃহত্তর ১৯৫০ সালের পূর্ব পাকিস্তান দাঙ্গার সঙ্গে সম্পর্কিত, যার প্রভাব চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড এলাকায়ও পড়ে।

ঐতিহাসিক পটভূমি ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পর পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর বিভিন্ন সময়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। ১৯৪৯–৫০ সালে গুজব, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার কারণে বিভিন্ন জেলায় দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বরিশাল, খুলনা, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বহু এলাকায় সহিংসতা দেখা যায়।

সীতাকুণ্ডে কী ঘটেছিল?
স্থানীয় সূত্র ও ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, মহা শিবরাত্রি উপলক্ষে চন্দ্রনাথ মন্দিরে সমবেত হিন্দু তীর্থযাত্রীদের ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়। এরপর হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ঘটনা ঘটে। বহু মানুষ নিহত ও আহত হন; সঠিক সংখ্যার বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড় ও মন্দির এলাকা এই ঘটনার কেন্দ্রস্থল হিসেবে উল্লেখিত।

১৯৫০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শীতের শেষ ধাপ। চট্টগ্রামের আকাশে তখনও হালকা কুয়াশা দেখা যায় এদিক সেদিক । সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে মহা শিবরাত্রির মেলা বসেছে। হাজার হাজার তীর্থযাত্রী আসছে মেলায়। পূর্ব পাকিস্তানের গ্রাম থেকে,ভারতের আসামের চা-বাগান থেকে, ত্রিপুরার ছোট ছোট শহর থেকে—সবাই আসছেন ভগবান শিবের আরাধনার জন্য। অনেকে পায়ে হেঁটে, অনেকে ট্রেনে, কেউ কেউ স্টিমারে। রেল স্টেশনে প্রচুর ভিড়,লঞ্চ  ঘাটে ভিড়, পাহাড়ের পথে ভিড়। সবার মনে কেবল শিবের নাম। সবার অপেক্ষা চন্দ্রনাথ দর্শন।

রামকুমার নামের এক যুবক, তার বৃদ্ধ মা আর ছোট বোনকে নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেন ধরেছিল। তারা গ্রামের মানুষ, সারা বছর অপেক্ষা করে এই একদিনের জন্য। রামকুমারের হাতে একটা ছোট্ট থলে—ভেতরে ফল, মিষ্টি আর শিবলিঙ্গে দেওয়ার জন্য ফুল। ট্রেনটা সীতাকুণ্ড স্টেশনে ঢোকার সময় সন্ধ্যা নেমে এসেছে।

ট্রেন থামতেই হঠাৎ চিৎকার হিন্দু হিন্দু বলে কয়েকটা গলা একসঙ্গে তারপর শুরু হলো গুলি করা বেয়নেট চার্জ। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো যাত্রীদের উপর লাঠি, ছুরি, কিরিচ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল একদল লোক। তৎকালীন আনসার বাহিনীর কয়েকজনও ছিল তাদের সঙ্গে। ট্রেনের জানালা ভেঙে ভেতরে ঢুকতে শুরু করল আক্রমণকারীরা। এদিকে মহিলারা চিৎকার করছে, বাচ্চারা কাঁদছে প্রচণ্ড ভয়ে। রামকুমার তার মাকে জড়িয়ে ধরে এক কোণে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। একটা লোক তার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই হিন্দু, তোরা এখানে কী করিস?” তারপর কিরিচের এক ঘা। রক্ত ছিটকে পড়ল। মা চিৎকার করে উঠলেন রাম রাম বলে কিন্তু তার গলা থেকে স্বর বের হল না প্রাণ হারালেন ওখানেই।

রেললাইনের ধারে শত শত হিন্দুদের লাশ পড়তে লাগল। কেউ কেউ ট্রেন থেকে লাফ দিয়ে পালাতে গিয়ে রেলের নিচে পড়ে মরল। অনেককে ধরে নিয়ে পাহাড়ের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো, সেখানে আরও বেশি নির্যাতন চলল। কেউ পেটাচ্ছে- কেউ মারচ্ছে ইচ্ছেমত। মেলার মাঠে যারা তাঁবু খাটিয়ে আগেরদিন রাতেও ঘুমিয়েছিল, তাদেরও ছাড়া হলো না। আগুন লাগানো হলো তাঁবু ,ঘর-বাড়িতে। ধোঁয়া আর চিৎকারে ভরে গেল চন্দ্রনাথের পাহাড়ের পাদদেশ। যে শিবলিঙ্গের সামনে হাজারো মানুষ প্রণাম করত, সেখানেও রক্ত ছিটকে পড়ল। তরতাজা হিন্দুর রক্ত।

১৬ ফেব্রুয়ারী পরেদিন সকাল সূর্য উঠেছে, কিন্তু সূর্যের আলো ম্লান সেই রেললাইনের। নিহত ও ক্ষয়ক্ষতি নির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান স্পষ্ট নয়।বিভিন্ন গবেষণায় নিহতের সংখ্যা কয়েক ডজন থেকে কয়েক শতাধিক পর্যন্ত বলা হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়। ঐ সময়ের তথ্য সংগ্রহ সীমিত হওয়ায় নির্ভুল সংখ্যা পাওয়া কঠিন।

বৃহত্তর প্রভাব ১৯৫০ সালের দাঙ্গা শুধু সীতাকুণ্ডেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে:
ভারতের প্রধানমন্ত্রী Jawaharlal Nehru
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী Liaquat Ali Khan
একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন—
Nehru–Liaquat Pact (এপ্রিল ১৯৫০)
এই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং শরণার্থী সংকট কমানো।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব পূর্ব পাকিস্তান থেকে হিন্দুদের ব্যাপক দেশত্যাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল এই দাঙ্গা। সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। গবেষণা ও তথ্যসূত্র (সংক্ষেপে) ১৯৫০ সালের পূর্ব পাকিস্তান দাঙ্গা সংক্রান্ত ঐতিহাসিক গবেষণা তৎকালীন পত্রিকা প্রতিবেদন স্মৃতিকথা ও মানবাধিকার বিষয়ক নথি এখনো পাওয়া যায়।

শ্রী বাবলু মালাকার,
সনাতন ধর্মের বৈদিক বেদবেদান্ত প্রচারক;
সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ, বাংলাদেশ।

Post a Comment

0 Comments