হিন্দু বিবাহিত সধবা নারীদের শাঁখা সিঁদুর দেয়ার বা পরার কারণ কি?



একটি পুরুষ যখন নারীকে বিয়ে করে তখন সে পবিত্র বেদ মন্ত্র উচ্চারণ করে বিয়ে সম্পূর্ণ করতে হয় এবং অনেক গুলো মন্ত্র উচ্চারণ করে তার মধ্যে একটা যে পবিত্র মন্ত্রটি উচ্চারণ করেন তা হলো:

"যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব"

এই মন্ত্রের অর্থ—‘আমার হৃদয় তোমার হোক, এবং তোমার হৃদয় আমার হোক’। এটি দম্পতির মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও অটুট বন্ধনের প্রতীক, যা বিবাহের পূর্ণতা প্রদান করে।

একটি নারী দম্পতির মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও অটুট বন্ধনের প্রতীক হিসেবে শাঁখা সিঁদুর মাধ্যমে মর্যাদা দিয়ে থাকেন সে মর্যাদা রক্ষা করা একটি নারী কর্তব্য।

শাস্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায় অষ্টম শতকের আদি শঙ্করাচার্য বিরচিত সৌন্দর্যলহরীতে -

তনোতু ক্ষেমং ন-স্তব বদনসৌন্দর্য়লহরী

পরীবাহস্রোতঃ-সরণিরিব সীমন্তসরণিঃ । 

বহন্তী- সিন্দূরং প্রবলকবরী-ভার-তিমির

দ্বিষাং বৃন্দৈ-র্বন্দীকৃতমেব নবীনার্ক কেরণম।। 

(সৌন্দর্য লহরী, শ্লোক ৪৪)

এই শ্লোকটি আদি শঙ্করাচার্য বিরচিত বিখ্যাত সৌন্দর্যলহরী স্তোত্রের (৪৪ নম্বর শ্লোক) অংশ, যেখানে দেবী পার্বতীর সীমন্ত (সিঁথি) ও সিঁদুরের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

বাংলা অনুবাদ:

দেবী পার্বতীর সুন্দর বদন-লাবণ্যের (সৌন্দর্য) প্রবাহধারা যেন তাঁর সিঁথির রেখা দিয়ে বয়ে চলেছে। তাঁর ঘন কালো কেশপাশ (কবরী-ভার) হলো নিবিড় অন্ধকার, আর সেই অন্ধকারে সিঁথির সিন্দুর যেন বন্দি হয়ে থাকা নবীন সূর্যের কিরণ।

মূল ভাব:

এই শ্লোকটি দেবীর সিঁথির সৌন্দর্যকে একটি উপমার মাধ্যমে তুলে ধরেছে, যেখানে ঘন চুলকে অন্ধকারের সাথে এবং সিঁথির লাল সিন্দুরকে সেই অন্ধকারে আটকে পড়া সূর্যের আলোর সাথে তুলনা করা হয়েছে। এটি দেবীর রূপের বর্ণনা এবং মঙ্গল কামনায় রচিত একটি স্তোত্র।


মনুস্মৃতি (৫/১৫৮) এ বলা হয়েছে—

“পতিভক্তি ও সতীত্বই নারীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম।।”

এখানে বাহ্যচিহ্ন নয়,

ভক্তি ও আচরণকেই মুখ্য বলা হয়েছে।।


স্কন্দ পুরাণ ও পদ্ম পুরাণ, এ উল্লেখ আছে যে,

সিঁদুর ও শঙ্খা স্বামীর মঙ্গল ও দীর্ঘায়ুর কামনায় শুভ লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত।। এগুলো “সৌভাগ্যচিহ্ন”।।

এটি হিন্দু বিবাহে সিঁদুর দানের সময় পঠিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্র, যা স্বামীর দীর্ঘায়ু ও সৌভাগ্য কামনায় উচ্চারিত হয়।


সিঁদুর দেওয়ার ধ্যান মন্ত্রঃ-

শিরোভূষণ সিন্দুরং ভর্ত্তুরায়ু বিবর্দ্ধনং। 

সর্বরত্নাকরং দিব্যং সিন্দুরং প্রতিগৃহ্যতাম্ ।।


সম্পূর্ণ মন্ত্রটি অর্থ হলোঃ-

শিরোভূষণ সিন্দুরং: সিঁদুর হলো মস্তকের ভূষণ।

ভর্ত্তুরায়ু বিবর্দ্ধনং: যা স্বামীর আয়ু বা দীর্ঘজীবন বৃদ্ধি করে।

সর্বরত্নাকরং দিব্যং: সকল রত্নের আকর বা শ্রেষ্ঠ এবং অলৌকিক।

সিন্দুরং পতিগৃহ্যতাম্: এই সিঁদুর স্বামী বা পতি গ্রহণ করুন।


সহজ কথায়, এই মন্ত্র দ্বারা নববধূ তার স্বামীর দীর্ঘায়ু এবং সংসারে মঙ্গল কামনায় সিঁদুর ধারণ করেন। এটি শুধু অলংকার নয়, বরং বিবাহিত নারীর 'সৌভাগ্যবতী' হওয়ার প্রতীক। এবং এটি ধারণের মাধ্যমে পরিবারে সুখ, শান্তি ও স্বামীর মঙ্গল কামনা করা হয়।

মস্তকের অলংকারস্বরূপ এই সিঁন্দুর, যা স্বামীর আয়ু বা দীর্ঘ জীবন বৃদ্ধি করে এবং সমস্ত রত্নের আকরস্বরূপ—হে দিব্য সিঁদুর, তোমাকে গ্রহণ করছি।

প্রয়োগ: বিবাহের সময় বা নিত্য পূজার পর নারীগণ স্বামীর দীর্ঘায়ু কামনায় সিঁথিতে সিঁদুর পরার সময় এই মন্ত্রটি উচ্চারণ করেন।

তাৎপর্য: সিঁদুর নারীর সৌভাগ্যের প্রতীক এবং এটি ধারণের মাধ্যমে পরিবারে সুখ, শান্তি ও স্বামীর মঙ্গল কামনা করা হয়। 


শাঁখা পড়ানোর মন্ত্রঃ-

ওঁ শঙ্খালঙ্কারং বিবিধং চিত্রং বাহুনাঞ্চ বিভূষণম্।

মহোদধিসম্ভূতাঃ সর্বদেবীপ্রিয়া সদা।

শঙ্খ বলয় কন্যাভূষণানাং সদুত্তমম্।।


এটি হিন্দু বিবাহ বা বিবাহোত্তর অনুষ্ঠানে নববধূর হাতে শাঁখা বা শাঁখা-বলয় পরানোর মন্ত্র। এই মন্ত্রের মাধ্যমে শাঁখাকে সমুদ্রজাত (মহোদধিসম্ভূতাঃ), দেবীপ্রিয়, এবং বাহুর অলঙ্কার হিসেবে বর্ণনা করে তা পরিধান করা হয়। 


সম্পূর্ণ মন্ত্রটি অর্থ হলোঃ-

শঙ্খালঙ্কারং বিবিধং চিত্রং বাহুনাঞ্চ বিভূষণম্: শঙ্খ নির্মিত বিচিত্র অলঙ্কার যা বাহুর (হাতের) ভূষণ বা শোভা বর্ধন করে।

মহোদধিসম্ভূতাঃ সর্বদেবীপ্রিয়া সদা: যা মহান সমুদ্র (মহোদধি) থেকে উৎপন্ন এবং সর্বদা সকল দেবীর প্রিয়।

শঙ্খ বলয় কন্যাভূষণানাং সদুত্তমম্: শঙ্খের তৈরি এই বলয় বা শাঁখা নারীদের অলঙ্কারের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। 

বিবাহের সময় বধূকে শাঁখা-পলা পরানোর সময় এই মন্ত্র উচ্চারণ করা হয়, যা সনাতন ধর্মে বিবাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রীতি।

নিয়মিত সিঁদুর পরার মন্ত্র অনেকেই হয়তো জানেন না জেনে নিন সাধ্বী নারীর সিঁদুর ধারণ দেয়ার মন্ত্র—


সিঁথিতেঃ-  ওঁ কৃষ্ণায় নমঃ।

কপালেঃ-  ওঁ কেশবায় নমঃ।

কণ্ঠেঃ-  ওঁ গোবিন্দায় নমঃ।

শঙ্খেঃ- ওঁ মধুসুদনায় নমঃ।

বস্ত্রেঃ- ওঁ মাধবায় নমঃ।


শাস্ত্রে বলা আছে,

 “সৌভাগ্যবতী” নারীর লক্ষণ হিসেবে সিঁদুর,শঙ্খা, মঙ্গলসূত্র প্রভৃতির কথা এসেছে—তবে এগুলো মূলত শুভসংকেত,অপরিহার্য বাধ্যবাধকতা নয়।।


তাহলে খুলে ফেললে কি অপরাধ?

শাস্ত্রে কোথাও স্পষ্টভাবে বলা নেই যে শাঁখা–সিঁদুর না পরলে স্বামীর অমঙ্গল অবশ্যম্ভাবী।। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে স্বামীর মঙ্গলচিহ্ন ত্যাগ করা মানসিক দূরত্ব বা অবহেলার প্রতীক হতে পারে—যা দাম্পত্য সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।।


দাম্পত্য জীবন টিকে থাকে—

১) পারস্পরিক শ্রদ্ধা

২) বিশ্বাস

৩) ধর্মানুসারী জীবনযাপন

৪) মানসিক সংযোগের উপর


শাঁখা–সিঁদুর বাহ্যিক প্রতীক;

কিন্তু অন্তরের সতীত্ব, ভালোবাসা ও ভক্তিই প্রকৃত শক্তি।।


নারী আধুনিক হওয়া অপরাধ নয়,

তবে নিজের সংস্কৃতি ও প্রতীকের মর্যাদা বোঝা জরুরি।


যারা আধুনিক হওয়ার জন্য নিজের ধর্ম শাস্ত্র মানে না,

ধর্ম শাস্ত্রের কথা মর্যাদা দেয় না তাদেরকে আমি বলি—


বেশ্যাকে ধর্মজ্ঞান দিয়ে লাভ হয় না।

কারণ যৌবন ধর্মকেও পরোয়া করে না।

যেমন ছলনাময়ী কোনো প্রেমিকা বা প্রেমিকের,

বিশুদ্ধ প্রেমকে পরোয়া করে না।


শ্রী বাবলু মালাকার

সনাতন ধর্মের বেদ বেদান্ত প্রচারক,

সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ, বাংলাদেশ।

Post a Comment

0 Comments