প্রকৃত অখণ্ড ধর্ম কি?
আমাদের অখণ্ড ধর্মের সম্রাজ্যের মহান সংগঠক শ্রীকৃষ্ণ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, মহাভারত, ভাগবত, পুরাণ, বিষ্ণুপুরাণের মত ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলো থেকে কবিয়াল ও সাহিত্যিকরা কাব্য সৃষ্টি করতে গিয়ে ও কাব্যিক সৌন্দর্যে রুপায়িত করতে গিয়ে বীর শ্রীকৃষ্ণকে লীলাময় কৃষ্ণে রুপান্তর করেছে। সাহিত্য রচনা করতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণের মহাজীবনকে শুধু বাৎসল্যরতি, দাস্যরতি, সখ্যরতি ও কান্তরতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। অথচ আমরা ভূলে গেলাম মহাবীর্যঘনমুর্তি শ্রীকৃষ্ণই ধর্ম সম্রাজ্য সংগঠক ও অখণ্ড ভারতের রচয়িতাকে। তাই যেদিন থেকে শ্রীকৃষ্ণের নাম শুনে হিন্দুজাতি কাঁদতে শিখেছে, সেদিন থেকেই হিন্দু জাতির অধঃপতন শুরু হয়েছে। বরং শ্রীকৃষ্ণের নাম শুনার সাথে সাথে হিন্দুদের রক্তে বারুদ লাগার কথা।
আমাদের ধর্ম কিভাবে অখণ্ড হবে?
ধর্ম সবার জন্য, সব অবস্থার জন্য। ধর্মসাধনার জন্য অন্তরাবৃত্ত হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তারজন্য জগৎ হতে দূরে চলর যেতে হবেই এমন কোনও কথা নাই। অবশ্য কেউ যদি প্রাণের দুর্দম আবেগে সংসার থেকে ছিটকে বেরিয়ে যায়, তাকে বাধা দেবারও কোনও সঙ্গত কারণ নাই। কেননা মানুষ এবং একমাত্র মানুষই সর্বাবস্থায় স্বতন্ত্র থাকতে পারে। এমনি করে যারা বেরিয়ে যায়, তারা আবার ফিরেও আসে অর্জিত সম্পদ জগৎকে দেবার জন্য। তবে এসব প্লান করে হয় না। এক্ষেত্রে চলতে হবে একটা উদার দৃষ্টি নিয়ে এবং অন্তরের প্রেরণা অনুযায়ী। গীতার ধর্মসাধনার একটা সার্বভৌম পথ দেখানো হয়েছে। সেখানে যোগ করতে বলা হয়েছে কুরুক্ষেত্রে গিরিগুহায় নয়।
এই বিষয়ে আমরা শ্রীকৃষ্ণকে অনুসরণ করতে পারি না কি?
চিত্তের স্বচ্ছতা আসে যদি তাকে দ্বন্দ্বমুক্ত করা যায়। 'ভাল-মন্দ যাহাই আসুক, সত্যের লও সহজে'—এইটি আদর্শ হওয়া চাই। সর্বদা সমনস্ক থাকা, অর্থাৎ হুঁশে থাকা এতেও চিত্ত প্রসন্ন অর্থাৎ স্বচ্ছ হয়। আর স্বচ্ছ হয় অনন্তসমাপত্তি বা ব্যাপ্তিচৈতন্যের অভ্যাসে। আকাশভাবনা তার অনুকূল। তুমি যে জ্যােতি দেখ, এটা ব্রহ্মসাক্ষাৎকারে অনুকূল অবস্থা। যোগে একে বলে প্রাতিভসংবিৎ। এই জ্যােতিকে নিজের মধ্যে আবাহন করে এনো কিংবা হৃদয়ে ওই জ্যােতির ধ্যান করো, যাতে তোমার দেহের অণু-পরমাণু ওই জ্যােতিতে অভিষিক্ত হয়ে তোমাকে আলোর মেয়ে করে তোলে। তার সংস্কারকে যদি চলতে-ফিরতে সবসময় বহন করতে পার, তাহলে 'ধাতুপ্রসাদ'হেতু চিত্তের স্বচ্ছতা আপনাহতেই এসে যাবে। সংসারে দুটি জীবন যুগপৎ যাপন করবে, বাইরে একটা কর্তব্যের জীবন, আর অন্তরে একটা ভাবের জীবন। তাহলেই অধ্যাত্মসাধনা অখণ্ড হবে।
(হৈমবতী ১১/৪/৬৯)
গীতার চতুর্থ অধ্যায়
(শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন)
ज्ञानयोगः
यदा यदा हि धर्मस्य ग्लानिर्भवति भारत । अभ्युत्थानमधर्मस्य तदात्मानं सृजाम्यहम् ॥
হে ভারত! যখনই যখনই ধর্মের গ্লানি এবং অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, আমি সেই সেই সময়ে নিজেকে সৃষ্টি করি (দেহ ধারণপূর্বক অবতীর্ণ হই)। (গীতা, ৪/৭)
परित्राणाय साधूनां विनाशाय च दुष्कृताम् । धर्मसंस्थापनार्थाय सम्भवामि युगे युगे ॥
সাধুগণের পরিত্রাণ, দুষ্টদিগের বিনাশ এবং ধর্মসংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই। (গীতা, ৪/৮)
ধর্ম কি?
ধর্ম মানে ধারণ
ধর্ম— ধর্ম শব্দটিও সংস্কৃত ধৃ ধাতু থেকে উতপত্তি। যার অর্থ হলো ধারন করা।
যেমন— জলের ধর্ম তরলতা, আগুনের ধর্ম উত্তাপ দেওয়া ইত্যাদি সেইরুপ মানুষের ধর্মও মানবতা।
সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম কাকে বলে?
সনাতন কথাটা একটা শাশ্বত, নিত্য বা চিরস্থায়ী কথা। সনাতন শব্দটার অর্থই হল-যা অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। "সদা" শব্দের সাথে "ষ্টন" প্রত্যয় যোগ করলে সনাতন শব্দটা নিস্পন্ন হয়। 'সদা' শব্দের অর্থ সর্বকাল আর 'ষ্টন' অর্থ স্থিত। অতএব সর্বকালের জন্য যা স্থিত তাই-সনাতন।
ধর্মই সত্ত্বা
'ধর্ম' একটি অখন্ড নিরপেক্ষ সত্ত্বা।
'ধৃ' ধাতুর সাথে 'মন' প্রত্যয় যোগ করলে 'ধর্ম' শব্দটি নিস্পন্ন হয়। 'ধৃ' ধাতুর অর্থ ধারন করা এবং 'মন' অর্থ সত্ত্বা অর্থাৎ ভুমা সত্ত্বা বা পরম ব্রহ্মের সূক্ষ্ম সত্ত্বা। অতএব সমগ্র সৃষ্টি পরমব্রহ্মের যে সূক্ষ্ম সত্ত্বা ধারন করে আছে তাকেই 'ধর্ম' বলে। তাহলে সনাতন ধর্ম এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে—এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সমস্তকিছুই সৃষ্টির শুরু থেকে পরমব্রহ্মের যে সূক্ষ্ম সত্ত্বা ধারন করে আছে এবং সৃষ্টির শেষ পর্যন্ত ধারণ করে থাকবে তাকেই অখণ্ড "সনাতন ধর্ম" বলে।
এখানে মূল ধর্মই হলো আদি, ও বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ। মূলত ধর্মই জ্ঞান ও গুনের সুন্দর সমন্বয় যা চিরন্তন সত্য। জীবের ও প্রকৃতির নিয়মের চিরন্তন প্রকাশ হলো ধর্ম।
ধর্মই সর্বোবৃহৎ মানবতাবাদী ধর্ম বলা হয়েছে। বলার কারণটাই হলো সনাতন ধর্মের বেদ শাস্ত্রকে বিশেষ করে প্রাধান্য দিয়েছে তাই থাকে আদি ধর্মগ্রন্থ বলা হয়েছে।
মনুর্ভব জনয়া দৈবং জনম্।
(ঋগ্বেদ, ১০/৫৩/৬)
প্রকৃত মানুষ হও এবং অন্যকেও মানুষ হিসেবে গড়ে তোল।
কিন্তু আমরা ধর্মকে ব্যবহার করছি বিভিন্ন মত পথ সম্প্রদায় ভুক্ত জাতি বিশেষের ক্ষেত্রে।
মূলত মানুষ কে?
একজন প্রকৃত মানুষ সে মূলত তিনটি গুনের সমষ্টি।
১) বিবেক
২) বুদ্ধি
৩) আত্মসংযম।
বিবেক— বিচার বিশ্লেষণ করা।
বুদ্ধি— ভালো মন্দ যাচাই করা।
আত্মসংযম— ধর্য্যশীল হওয়া।
তাহলে আমরা কি করছি?
বেদ
"বেদ অখিল ধর্ম মুলম"
(মনুস্মৃতি, ২/৬)
এর অর্থ বেদই হলো প্রকৃত ধর্মমুল।
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন—
"যে সকল মতামত বেদ বিরোধী সেই সকল নবগ্রন্থের মতামতকে নির্দয় ভাবে বাদ দিতে হবে সনাতন ধর্ম থেকে"।
লোকনাথ ব্রহ্মচারী ও শ্রী রামকৃষ্ণ ঠাকুর স্পষ্ট করে বলেছেন—
পরমব্রহ্মই এক মাত্র গুরু, তিনি ভিন্ন অন্য
কোন গুরু নেই জগতে।
সনাতন ধর্মে বেদ প্রধান ধর্মগ্রন্থ, বেদ চর্চা করা সবার উচিত।
তাই ধর্ম প্রচারে বৈদিক নির্দেশ
ধর্মাদর্থঃ প্রভবতি ধর্মাৎ প্রভবতর সুখম্।
ধর্মেণ লভতে সর্ব্য ধর্মসারমিদং জগৎ।।
(অরণকাণ্ড, ৯/৩০)
অনুবাদঃ— ধর্ম হতেই অর্থ এবং প্রভাব আসে, ধর্ম থেকেই সুখ উৎপন্ন হয়। ধর্মের দ্বারাই জগতে সকল অভীষ্ট বস্তুর লাভ হয়; সুতরাং এ জগতে ধর্মই প্রকৃত সারবস্তু। তাই সকলেরই ধর্মের শরণে থাকার সর্বদা চেষ্টা করা উচিত।
ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি!
জয় শ্রীরাম
হর হর মহাদেব
শ্রী বাবলু মালাকার
(সনাতন ধর্মের প্রচারক, বাংলাদেশ)।
0 Comments
ওঁ তৎ সৎ
নমস্কার