দ্বিতীয় পর্ব পবিত্র বেদ শুক্লযজুর্বেদ সংহিতার মহাকাল মহারুদ্র

শুক্ল যজুর্বেদীয় রুদ্রীপাঠ রুদ্রাষ্টাধ্যায়ী মহারুদ্রের আরাধনা, শিবলিঙ্গের উপর দুধ, দই, ঘি, মধু, সর্করা, গঙ্গাজল প্রদান করা হয়ে থাকে শ্রীঙ্গীর দ্বারা শিবলিঙ্গের উপরে অভিষেক হতে থাকে আর এই বেদমন্ত্র পাঠ চলতে থাকে তা ব্রাহ্মণ দিয়ে করানো হয় এই রুদ্রাভিষেক শিব পূজা। এই রুদ্র শিব পূজা করাতে পারলে মানুষের জীবনের সর্বচ প্রাপ্তি হয়ে থাকে সফলতা, রোগমুক্ত, দীর্ঘাযু, অকাল মৃত্যুবরণের হাত থেকে রক্ষা করেন মহারুদ্র মৃত্যুঞ্জয় মহাদেব।

মনঃ শিব-সঙ্কল্পমস্তু।
                         (শুক্ল যজুর্বেদ, ৩৪)

         আমার মন শুভ কল্যাণকর সঙ্কল্পযুক্ত হোক।

এই শুক্ল যজুর্বেদীয় রুদ্রাধ্যায়ী সম্পর্কে একটি ধারণা বেদের মধ্যে ভগবান শিব কে আমরা রুদ্র নামে জানি। পূর্বকালে হইতে শ্রদ্ধালু বেদধ্যায়ী মানুষ গন অাত্মকল্যাণের শুক্লযজুর্বেদ থেকে আট উপযোগী অধ্যায় কে চরণ করে "রুদ্রাষ্টাধ্যায়ী" নামক গ্রন্থ হয়।

এই রুদ্র শিব হল অন্যতম জনপ্রিয় একটি হিন্দু মন্ত্র এবং শৈব সম্প্রদায়ের তাৎপর্যবাহী মন্ত্র। নমঃ শিবায়-এর অর্থ হল "ভগবান শিবকে নমস্কার" বা "সেই মঙ্গলময়কে প্রণাম!" করা এই মহারুদ্র শিবকে পঞ্চাক্ষর মন্ত্রও বলা হয় যার মানে "পাঁচ-অক্ষরযুক্ত" মন্ত্র (ওঁ ব্যতীত)। এটি ভগবান মহারুদ্র শিবের প্রতি সমর্পিত হওয়া। এই মন্ত্রে শ্রী রুদ্রম্ চমকম্ ও রুদ্রাষ্টাধ্যায়ীতে "ন", "মঃ", "শি", "বা" এবং "য়" রূপে প্রকাশিত। শ্রী রুদ্রম্ চমকম্, কৃষ্ণ যজুর্বেদের অংশ এবং রুদ্রাষ্টাধ্যায়ী, শুক্ল যজুর্বেদ-এর অংশ।

নমস্কার সবাইকে শিবরাত্রির অগ্রিম শুভেচ্ছা শিবরাত্রি তাই যজুর্বেদ এর রুদ্র স্তুতি—

ওঁ নমস্তে রুদ্র মন্যব উতো ত ইষবে নমঃ।
বাহুভ্যামুত তে নমঃ।।
                  (শুক্ল যজুর্বেদ, ১৬/১)

ওঁ যা হে রুদ্র শিবা তনূরঘোরাহপাপকাশিনী।
তয়া নস্তন্বা শম্তময়া গিরিশম্তাভি চাকশীহি।।
                  (শুক্ল যজুর্বেদ, ১৬/২)

ওঁ নমো ভবায় চ রুদ্রায় চ নমঃ শর্বায় চ পশুপতয়ে
চ নমো নীলগ্রীবায় চ শিতিকন্ঠায় চ।।
                  (শুক্ল যজুর্বেদ, ১৬/২৮)

ওঁ নমঃ শম্ভবায় চ ময়োভবায় চ নমঃ শঙ্করায় চ ময়স্করায় চ নমঃ শিবায় চ শিবতরায় চ।।
                  (শুক্ল যজুর্বেদ, ১৬/৪১)

অনুবাদঃ— হে দুঃখনাশক জ্ঞানপ্রদ রুদ্র, তোমার ক্রোধের উদ্দেশ্য নমস্কার,  তোমার বাণ ও বহুযুগলকে নমস্কার করি।
                    (শুক্ল যজুর্বেদ, ১৬/১)

হে রুদ্র, তোমার যে মঙ্গলময়, সৌম্য, পূণ্যপ্রদ শরীর আছে, হে গিরিশ, সে সুখতম শরীরের দ্বারা আমাদের দিকে তাকাও। হে গিরিশ, তুমি হস্তে যে বাণ ধারণ করেছ, তা কল্যাণকর কর, পুরুষ ও জগতের হিংসা করো না।  জগতের সকল নীরোগ ও শোভনমনস্ক হোক। তুমি সকলের পূজ্য ও দেবগণের হিতকারী ভিষক।
                     (শুক্ল যজুর্বেদ, ১৬/২)

ভব ও রুদ্রকে নমস্কার। পশুপতিকে নমস্কার। নীলগ্রীব ও শিতিকণ্ঠকে নমস্কার।
                    (শুক্ল যজুর্বেদ, ১৬/২৮)

মুক্তি সুখ ও সাংসার সুখ দাতা রুদ্রকে নমস্কার, লৌকিক ও মোক্ষসুখের কারক রুদ্রকে নমস্কার, যিনি কল্যাণরুপ ও ভক্তজনের কল্যাণ-বিধাতা সে রুদ্রকে নমস্কার। গোসমূহে জাত ও গোষ্ঠে জাত, তীর্থে ও কূলে জাত, পাষাণে বা স্থির জলে জাত, অরণ্যপ্রদেশে ও গিরিগুহায় জাত এবং ধূলিতে ও পরাগে জাত রুদ্রকে নমস্কার। রুদ্রের দেবতার অগ্নি, বায়ু ও সূর্য দেবতাদের নমস্কার।
                     (শুক্ল যজুর্বেদ, ১৬/৪১)

ঋগ্বেদীয় রুদ্র বেদি সিন্ধু মন্ত্র পড়বেন,

ওঁ শন্নো ইন্দ্রো বসুভির্দেবো অস্তু শমাদিত্যেভির্বরুণঃ সুশংসঃ।
শং নো রুদ্রো রুদ্রেভির্জলাষঃ শংনস্ত্বষ্টা গ্নাভিরিহ শৃণোতু।। (৬)
শং নঃ সোমো ভবতু ব্রহ্ম শং নঃ শং নো গ্রাবাণঃ শমু সন্তু যজ্ঞাঃ।
শং নঃ স্বরুণাং মিতয়ো ভবন্তু শং নঃ প্রস্বঃ শম্বস্তু বেদিঃ।। (৭)
শন্নঃ সূর্য্য উরুচক্ষা উদেতু শন্নশ্চতস্র প্রদিশো ভবন্তু।
শং নঃ পর্বতা ধ্রুবয়ো ভবন্তু শং নঃ সিন্ধবঃ শমু সন্ত্বাপঃ।। (৮)
                      (ঋগ্বেদ, ৭/৩৫/৬-৮)

অনুবাদঃ— ঐশ্বর্য্যময় প্রভু আমাদিগকে নিবাস স্থানে আমাদের কল্যাণ করুন। বরণীয় পরমাত্মা সূর্য্য কিরণ দ্বারা কল্যাণ করুন। শান্তিদাতা পরমাত্মা স্বীয় তেজ দ্বারা আমাদের মঙ্গল বিধান করুন। জগতের স্রষ্টা আমাদিগকে বাণী প্রদান করিয়া কল্যাণ করুন এবং আমাদের এই আহ্বান শ্রবণ করুন। (৬)

মেধাবর্দ্ধক ওষধি আমাদের জন্য সুখদায়ক হউক। বেদ পাঠ আমাদের মঙ্গল দান করুক, শিলা ও যজ্ঞ আমাদের জন্য শান্তিপ্রদ হউক। বেদির স্তম্ভ ওষধি এবং বেদির অন্যান্য দ্রব্য আমাদের মঙ্গল দায়ক হউক। (৭)

জ্যোতির্ময় সূর্য্য আমাদের জন্য কল্যাণকারী রুপে উদিত হউক। চারিদিক আমাদের জন্য সুখময় হউক। অচল পর্বত, সচল সিন্ধু এবং জলরাশি আমাদের সুখ দান করুক। (৮)

ওঁ এক শক্তিকেই আমরা বিভিন্ন নামে প্রকাশ পাই—

                                   ওঁ
               ব্রহ্মা + ব্রহ্মাণী + মহাসরস্বতী
                 বিষ্ণু + বৈষ্ণবী + মহালক্ষ্মী
                  শিব + শিবানী + মহাকালী
                             ব্রহ্ম + শক্তি
                           পুরুষ + প্রকৃতি

চন্দ্র ও চন্দ্রের কিরণ দুধ ও দুধের ধবলতার ন্যায় এক ও অভেদ।

শিব শব্দের অর্থ ও কল্যাণ। সেই কল্যাণ স্বরূপ ব্রহ্মই শিব। বেদে এবং উপনিষদে তাকে রুদ্র নামে অভিহিত করা হয়েছে।

শ্বেতাশ্বতরোপনিষৎ বলছে—

                একো হি রুদ্রো ন দ্বিতীয়ায় তস্থূ।

রুদ্র এক এবং অদ্বিতীয়। অর্থাৎ এখানে বোঝা যাচ্ছে পরমাত্মা শিব এক এবং অদ্বিতীয়।

ঋষি মন্ত্রে বলেছেন—

      যা তে রুদ্র শিবা তনূরঘোরাহ পাপকাশিনী।
      তয়া নস্তনুবা শন্তময়া গিরিশন্তাভিচাকশীহি।।

হে রুদ্র, হে গিরিশন্ত, তোমার যাহা মঙ্গলময়, প্রসন্ন ও পাপবিনাশক তনু, সেই সুখতম তনুর সহিত আমাদিগের নিকট প্রকাশিত হও। পরমেশ্বর বাস্তবে নিরাকার। কিন্তু ভক্তের ভাবে তিনি সাকার। ঋষি প্রথমে পরমেশ্বরের এক এবং অদ্বিতীয় স্বরূপের কথা বর্ণনা করলেন। পরবর্তী মন্ত্রে তিনি তার দিব্য তনুর ব্যাখ্যা করলেন।

পরমেশ্বরের নিরাকার স্বরূপটি, যোগীর কাছে অধিক প্রিয়। আবার সাকার স্বরূপটি ভক্তদের কাছে প্রিয়। তাহাকে জানলেই এই ভবসাগর পারাপার হয়ে যায়।
মায়ার বন্ধন থেকে মুক্তি ঘটে, অচিরেই ব্রহ্ম
জ্ঞানলাভ পূর্বক, নির্বাণ সুখ অনুভূত হয়।

বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তমাদিত‍্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ।
তমেব বিদিত্বাহ তিমৃত‍্যুমেতি নান‍্যঃ পন্থা বিদ‍্যতেহ য়নায়।

আমি পরিপূর্ণ, সর্বাধিক, স্বয়ং প্রকাশ ও অবিদ্যার অতীত ইহাকে জানিয়াছি; তাহাকেই মাত্র জানিয়া মৃত্যুকে অতিক্রম করিয়া থাকেন; (সংসার) উত্তরণের অন্য কোন ও মার্গ নাই।

মহাদেব শিব সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ—
শিব শব্দটির উল্লেখ বেদে আছে তবে তা রুদ্রের বিশেষণে। পৌরাণিক শিব এবং বৈদিক রুদ্র এক অভিন্ন। শিবের আটটি বিশেষ রূপকে একত্রে অষ্টমূর্তি বলে। এঁরা হলেন—ভব (অস্তিত্ব), শর্ভ (ধনুর্ধর), রুদ্র (যিনি দুঃখ ও যন্ত্রণা প্রদান করেন), পশুপতি (পশুপালক), উগ্র (ভয়ংকর), মহান বা মহাদেব (সর্বোচ্চ আত্মা), ভীম (মহাশক্তিধর) ও ঈশান (মহাবিশ্বের দিকপতি)। মহাদেবের গাত্রবর্ণ রজতগিরিনিভ অর্থ্যাৎ রুপালী পর্বতের ন্যায় শ্রভ্রবর্ণের। বৈদিক শিব পরমাত্মাবাচক। "শিবু কল্যাণে" ধাতু থেকে শিব শব্দ নিষ্পন্ন যার অর্থ শান্ত, মঙ্গলদায়ক, কল্যাণকারক প্রভৃতি। আর রুদ্র রোদনে অর্থাৎ যিনি পাপী-তাপীকে রোদন করান তিনিই রুদ্র। আবার আমাদের মৃত্যুর সময় দশ প্রাণ ও আত্মা এই একাদশ রোদন করে বলে নাম একাদশ রুদ্র।

ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি

জয় শ্রীরাম
জয় শ্রীকৃষ্ণ
হর হর মহাদেব  

দ্বিতীয় পর্ব লেখকঃ— শ্রী বাবলু মালাকার

Post a Comment

0 Comments