শ্রীকৃষ্ণকে কেন যোগেশ্বর বলা হয়েছে, তিনি কার যোগযুক্ত ছিলেন?

                          ভগবান শ্রীকৃষ্ণ

মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণের প্রকৃত বিশ্বরূপ কেমন ছিল দেখতে?

বর্তমানে আমরা সাধারণ মানুষ টিভি সিরিয়াল, চলচ্চিত্রের দৌলতে এবং কিছু ধান্দাবাজ ভন্ড পন্ডিতদের বিকৃত চিন্তাধারা ও তাদের লেখা বিকৃতশাস্ত্র প্রকাশের মাধ্যমে এটাই জেনে ও দেখে দেখে অভ্যস্থ যে মহাভারতে প্রকট হওয়া বিশ্বরূপ শ্রীকৃষ্ণেরই বিশ্বরূপ। কিন্তু আমরা যদি গভীর ভাবে মূল শাস্ত্র অধ্যয়ন করি তবে আমরা অবশ্যই জানতে পারবো যে, মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ময়দানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুন কে যে বিশ্বরূপ দর্শন করিয়েছিলেন সেটি দেহধারী শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ ছিলই না।

যদি সেই বিশ্বরূপ শ্রীকৃষ্ণের ছিলই না তবে সেই বিশ্বরূপ কার ছিল?

সেটি স্বয়ং পরমাত্মা পরমেশ্বরের বিশ্বরূপ ছিল। যিনি সর্বভূতের ঈশ্বর, যিনি যোগীগনের আরাধ্য, যিনি স্বয়ং ব্ৰহ্মা, তিনি স্বয়ং বিষ্ণু, তিনিই স্বয়ং রুদ্র। যোগীশ্রেষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা অর্জুন সেই পরমাত্মা পরমেশ্বর মহেশ্বরের বিশ্বরূপ দর্শন করেছিলেন।

এখানে পরমাত্মার বিশ্বরূপ কিভাবে দেখালেন?

শিব স্বয়ং পরমেশ্বর সমস্ত সনাতন ধর্মের মূল শাস্ত্র বেদ উপনিষদ ও পুরাণে পরমাত্মা পরমেশ্বর নামে একমাত্র শিবেরই মহিমা গায়ন করা হয়েছে। তবে শ্রীকৃষ্ণ আমি ব্ৰহ্মা, আমি বিষ্ণু, আমি রুদ্র আমিই সর্বভূতের ঈশ্বর, আমিই সমস্ত কিছুর আদি অন্ত আমার কোনো জন্ম মৃত্যু নেই।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একজন যোগী ছিলেন তাই তিনি যোগযুক্ত অবস্থাতে পরমাত্মার সাথে সংযুক্ত হয়েছিলেন। তখন শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমুখ থেকে যে বানী নির্গত হয়েছিল সেটি হল পরমাত্মা পরমেশ্বরের বানী। শুধুমাত্র শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকে পরমেশ্বর বলেছিলেন। যখন শ্রীকৃষ্ণ আমি সবকিছু আমি ঈশ্বর বলে সম্বোধন করেছিলেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ আমি বলতে দেহধারী ভগবান কৃষ্ণকে বোঝানো হয়নি, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজের আত্মাকে ঈশ্বর বলেছেন।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমি বলতে নিজের আত্মাকে বলেছেন কারন আত্মা পরমাত্মারই অবিচ্ছেদ্য স্বরূপ। তাই যোগীরা যোগসাধনার মাধ্যমে অন্তরের আত্মার সঠিক পরিচয় পেলেই উপলব্ধি করেন যে তিনি কোনো দেহধারী মনুষ্য নন তিনি পরমাত্মার অভিন্ন স্বরূপ। যারা সঠিকভাবে বেদান্ত চর্চা করেছেন তারা এই বিষয়টা সহজেই বুঝতে পারবেন।

                    "আমিই সর্বভূতের মহেশ্বর"

এটি পরমাত্মা পরমেশ্বর নিজেকে বলছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকে কিন্তু অজ্ঞান ব্যক্তিরা দেহধারী ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে ঈশ্বর বলে চিহ্নিত করে আছেন।

ভগবান শ্ৰীকৃষ্ণ যোগযুক্ত অবস্থায় পরমাত্মার সাথে সংযুক্ত হয়েছিলেন এবং অর্জুনকে পরমজ্ঞান দান করেছিলেন। তাই অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে শক্তিধর মনে করে বলেছেন—

বিশ্বকৰ্ম্মন্! নমস্তেহস্তু বিশ্বাত্মন্! বিশ্বসত্তম!।

তথা ত্বামভিজানামি যথা চাহং ভবান্ মতঃ।।

ত্বত্তেজঃসম্ভবো নিত্যং হুতাশো মধুসূদন।

রতিঃ ক্রীড়াময়ী তুভ্যং মায়া তে রোদসী বিভো!।।

(মহাভারত- ১৪/৬৭/৮-৯)

অনুবাদঃ— হে বিশ্বকৰ্ম্মন! হে বিশ্বাত্মন! হে বিশ্বশ্রেষ্ঠ! তোমাকে নমস্কার। আমি মনে মনে তোমাকে যেরূপ ধারণা করি, কার্যদ্বারাও তোমাকে সেইরূপই জানিতেছি। প্রভু মধুসূদন (শ্ৰীকৃষ্ণ)! অগ্নি সর্বদাই তোমার তেজ হইতে উৎপন্ন হন এবং রতি তোমারই ক্রীড়াস্বরূপা, আর স্বর্গ ও মর্ত্য তোমারই মায়া।

                (অনুবাদক, হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ)

তাৎপর্যঃ— এই শ্লোকটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

অশ্বমেধিকপর্বের শ্লোকটি দেখলে বুঝতে পারবেন।

ভগবান শ্ৰীকৃষ্ণ যোগযুক্ত হয়ে গীতা দান করেছিলেন,

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যোগযুক্ত হয়ে গীতা দান করেছিলেন তখন তিনি যোগযুক্ত ছিলেন অশ্বমেধিকপর্বের ১৭ তম অধ্যায়ের ১৩ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যখন বলেই দিয়েছেন যে- তিনি যোগযুক্ত হয়ে গীতা বলেছেন। অশ্বমেধিকপর্বের ৬৭ তম অধ্যায়ের ৮, ৯ নং শ্লোকে গিয়ে অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে—

         "হে বিশ্বকৰ্ম্মন, হে বিশ্বাত্মন, হে বিশ্বশ্রেষ্ঠ"

গুলো বলে সম্বোধন করেছিলেন। শুধু এটুকুই নয়, অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে আরও বলেছেন,

"অগ্নি সর্বদাই তোমার তেজ হইতে উৎপন্ন হন এবং - রতি তোমারই ক্রীড়াস্বরূপা, আর স্বর্গ ও মর্ত্য তোমারই মায়া"।

"যোগ" শব্দের অনেক অর্থ আছে। এখানে "যোগ" শব্দটি কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে তা স্পষ্ট বলা আছে। আসলে সেই শ্লোকে "যোগযুক্ত" বলতে বোঝানো হয়েছে।

"একাগ্রতার সহিত"

যোগযুক্তেন ঐক্যাগ্রসমন্বিতনে।

(ভারতকৌমুদী টীকা)

"ভগবান শ্রীকৃষ্ণ" যুদ্ধের প্রাক্কালে অর্জুনকে গীতা জ্ঞান সম্পর্কে বলেছিলেন। একাগ্রতার সহিত আলাপে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে গীতার জ্ঞান সম্পর্কে বললেন।

মহাভারতের শান্তিপর্বে (অনুগীতা আলোচনার অন্তর্গত) অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে আরেকবার পুনঃরায় গীতাজ্ঞান দিতে বলেছিলেন কিন্তু তখন শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন যে, হে অর্জুন! আমি পুনঃরায় সেই গীতা জ্ঞান দিতে অসমর্থ। আমি সেই যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাবস্থাতে প্রবেশ করে পরমাত্মার সাথে মিলিত হয়ে তোমাকে এই পরম গীতা জ্ঞান দিয়েছিলাম।

এবার প্রশ্ন হল, যিনি স্বয়ং ঈশ্বর তিনি একবার কেন হাজার বার থেকে শুরু করে অসংখ্যবার একই জ্ঞান বলে দিতে সক্ষম হবেন। তবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণই যদি ঈশ্বর তবে তিনি দ্বিতীয়বার বলতে অসমর্থ হলেন কেন?

         এখানে বিশ্বরূপ দর্শন দেখালেন কেন?

মূল শাস্ত্র বেদ বেদান্ত মতে, শিব স্বয়ং পরমাত্মা পরমেশ্বর। তিনি সমস্ত জীবের অন্তরে আত্মা রূপে অবস্থিত।

             ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন যে,

''আমি আমার আত্মা স্বরূপ রুদ্রের ভজনা করি (প্রমাণ - মহাভারত শান্তিপর্ব ৩২৭/২২) - এখানেই স্পষ্ট যে শ্রীকৃষ্ণ নিজের আত্মাকে স্বয়ং পরমেশ্বর পরমাত্মা শিব বলে প্রমাণ দিয়েছেন। প্রত্যেক জীবাত্মা শিবেরই স্বরূপ। যে ব্যক্তি নিজের যোগসাধনার দ্বারা নিজের আত্মার স্বরূপ জানতে পারবেন তিনিই শিবত্ব প্রাপ্ত হবেন তথা সিদ্ধপুরুষে পরিনত হবেন সর্বশেষে মোক্ষের অধিকারী হবেন। তাই যিনি এই গূঢ় রহস্য অবগত নন তিনি শুধুমাত্র দেহধারী শ্রীকৃষ্ণকেই পরমেশ্বর বলে জানবেন। কিন্তু যিনি এই রহস্য সম্পর্কে অবগত হবেন তিনিই প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করবেন। তাছাড়া শ্রীকৃষ্ণ মহাভারতের অনুশাসন পর্বে স্বয়ং পরমেশ্বর শিবের আরাধনা করেছিলেন,উপমন্য মুনির কাছে শিবমন্ত্রে দীক্ষাগ্রহণ করেছিলেন মাথা মুন্ডন করে কৌপীন বস্ত্র ধারন করেছিলেন ও সহস্র বছর তপস্যা করার পর মহেশ্বরের দর্শন পান ও কৃপালাভ করেন।

ঈশ্বর কি কখনো দীক্ষাগ্রহন করেন?

ঈশ্বর কি কখনো বরলাভ করেন?

গীতায় পরমেশ্বর বলেছেন যে আমার কোনো জন্ম মৃত্যু নেই। কিন্তু এখন যদি আমরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে ঈশ্বর ভাবি তবে সেটা আমাদের ভুল হবে। শ্রীকৃষ্ণ হলেন পঞ্চপাণ্ডবদের শক্তিধর যোগেশ্বর ভগবান।

এখন প্রশ্ন হলো ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কি মাতা দেবকীর গর্ভে জন্মাননি?

মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণের মৃত্যু সম্পর্কে লেখা আছে এবং শ্রীকৃষ্ণের দেহসৎকার করেছিলেন অর্জুন সহ পঞ্চপাণ্ডবরা মিলে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দেহদাহ হলেও তার নাভী দাহ হয়নি তাই সেটি সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে, যদি ভগবান শ্রীকৃষ্ণই ঈশ্বর হয়ে থাকেন তবে ঈশ্বরের মৃত্যু হয় কিভাবে?

গীতার জ্ঞান যদি ভগবান শ্রীকৃষ্ণেরই হতো তবে তিনি ঈশ্বর হইতেন। আর ভগবান শ্রীকৃষ্ণেরই বলেছিলেন যে তার জন্ম মৃত্যু নেই তাহলে কেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দেবকীর গর্ভে জন্ম নিয়ে ছিলেন এবং তীরের আঘাতে মৃত্যুটা কিভাবে সম্ভব হলো, ঈশ্বর যদি ভগবান শ্রীকৃষ্ণই হন তবে তিনি জন্ম মৃত্যুর অধীন কেন?

                গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,

আমি জন্মরহিত, অবিনশ্বর এবং সর্বভূতের শক্তিধর কাল হইয়াও স্বীয় প্রকৃতিতে অনুষ্ঠান করিয়া আত্মমায়ায় আবির্ভূত হই। (গীতা, ৪/৬)

হে ভারত! যখনই যখনই ধর্মের গ্লানি এবং অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, আমি সেই সেই সময়ে নিজেকে সৃষ্টি করি (দেহ ধারণপূর্বক অবতীর্ণ হই)। (গীতা,৪/৭)

সাধুগণের পরিত্রাণ, দুষ্টদিগের বিনাশ এবং ধর্মসংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই। (গীতা, ৪/৮)

এবার আপনি স্বয়ং বিচার করলে দেখবেন যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যোগাবস্থাতে পরমাত্মারই বানী প্রদান করেছিলেন, শ্রীকৃষ্ণ দেহধারী ছিলেন তাই তার জন্ম ও মৃত্যুও হয়েছে। গীতা জ্ঞান যেহেতু পরমাত্মার পরমেশ্বর ছিল তাই এক্ষেত্রে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ঈশ্বর নন। আমরা সবাই জানি পরমাত্মার মহেশ্বর শিব অজন্মা, শিব আদি ও অনন্ত, শিবের জন্ম মৃত্যু নেই, শিব কালেরও কাল মহাকাল, তিনি দেবাদিদেবও মহাদেব। পরমাত্মার সর্বভূতের ঈশ্বর তাই তিনি মহেশ্বর, গীতাতে পরমেশ্বর নিজেই বলেছেন যে, আমিই সর্বভূতের ঈশ্বর আমিই মহেশ্বর। কিন্তু ভন্ড পন্ডিত দের পাল্লায় পড়ে অজ্ঞান মানুষ এই জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত থাকে। গীতাতে যেহেতু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকে গীতা জ্ঞান নির্গত হয়েছে আর সেই সব অজ্ঞানী ব্যক্তিদের ধারনা অনুসারে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যেহেতু নিজেকে মহেশ্বর বলেছেন তাই তাদের কাছে শ্ৰীকৃষ্ণই মহাকাল আর ভগবান শ্রীকৃষ্ণই মহেশ্বর জন্মদাতা, এটা ভেবে শুধু একটা ভ্রমকে বিশ্বাস করে নেয়। আসলে যোগাবস্থাতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকে যে স্বয়ং পরমাত্মা পরমেশ্বর নিজেই নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন আমিই পরমাত্মা মহেশ্বর সেই রহস্য সেই সব অজ্ঞানীরা বুজতে পারলো না। তাই আমরা গীতায় ঈশ্বরের বিশ্বরূপ হিসেবে আজও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ছবিই দেখে পথচলা।

ধর্মশাস্ত্রে স্পষ্ট যে পরমাত্মা পরমেশ্বরের বিশ্বরূপ দর্শন করেছিলেন অর্জুনকে যোগীশ্রেষ্ঠ পরমশিবভক্ত শৈব ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দৌলতে।

যেখানে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মতো উপদেষ্টা এবং ধনুর্ধারী অর্জুনের মতো বীর থাকেন, সেখানেই বিজয়, ঐশ্বর্য, সমৃদ্ধি ও শাশ্বত কল্যাণময় নীতি বিদ্যমান থাকে। (গীতা ১৮/৭৮)


শ্রী বাবলু মালাকার

সনাতন ধর্মের প্রচারক, বাংলাদেশ

সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ।


জয় শ্রীরাম, হর হর মহাদেব

জয় যোগীশ্রেষ্ঠ পরমশৈব শ্রীকৃষ্ণের জয়।

Post a Comment

0 Comments