প্রথম পর্ব পবিত্র বেদ শুক্লযজুর্বেদ সংহিতার মহাকাল মহারুদ্র


শুক্লযজুর্বেদ সংহিতার ১৬ তম অধ্যায়টি পুরোটাই রুদ্ররূপী, শিবরূপী পরমব্রহ্মের স্তোত্র দিয়েই পূর্ণ।সমাজের প্রত্যেকটি শ্রেণী-পেশার মানবের মাঝেই রুদ্ররূপ ব্রহ্মের প্রকাশ। এই অধ্যায়ে আমাদের গুরুজন, বালক, তরুণ, গর্ভস্থ শিশু, পিতা, মাতা ও সকল আপনজনদের রক্ষা করার জন্যই এক প্রার্থনা করা হয় অসাধারণ কাব্যময়তায়।

এই এক ব্রহ্মরূপী রুদ্রই বৃক্ষ-লতা-গুল্মরূপে, জীবের পালকরূপে, সন্ন্যাসী, সাধু-সন্ত থেকে চোর, বাটপাড়, ছিনতাইকারী সকলরূপে (বেদে এভাবেই বলা) এক তিনিই বিরাজিত ; কারণ তিনি ছাড়া যে জগতে আর দ্বিতীয় কেউ নেই।

আমরা আজ কথায় কথায় বলি যে; বেদে দেবতার কথা নেই! আসলেই কি নেই? বেদের আরণ্যক অংশের প্রায় পুরোটা উপাসনাবিধি নিয়েই রচিত। বেদের সকল ভাষ্যকার বা ব্যাখ্যাকারই আরণ্যককে বেদ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন ; একমাত্র স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী ছাড়া। তাই যদি শুধুমাত্র স্বামী  দয়ানন্দ সরস্বতীর কথাই একমাত্র সত্যি হয় তবে পূর্ববর্তী সকল বেদভাষ্যকারদের কথাই মিথ্যা হয়ে যায়। যা নিয়ে বিস্তারিত বলার যথেষ্ট অবকাশ আছে।

আজ যে আমরা শিবের অভিষেক এবং সকল রোগনাশের জন্যে "ত্র‍্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধনম" মন্ত্র এবং শিবের উপাসনার প্রধান মন্ত্র "ওঁ নমঃ শিবায়" জপ করি ; এ সকল মন্ত্রই বেদ থেকেই নেয়া। 

নমঃ শম্ভবায় চ ময়োভবায় চ।
নমঃ শঙ্করায় চ ময়স্করায় চ।
নমঃ শিবায় চ শিবতরায় চ।।
(শুক্লযজুর্বেদ সংহিতা : ১৬.৪১)

" মুক্তি এবং সংসারসুখদাতা ভগবান শিবকে নমস্কার, লৌকিক ও মোক্ষসুখের কারক শিবকে নমস্কার ; যিনি কল্যাণরূপ হয়ে ভক্তজনের কল্যাণ-বিধান করেন সেই ভগবান রুদ্রকে নমস্কার। "

বেদের তৈত্তিরীয় আরণ্যকের দশম প্রপাঠকের ২২ অনুবাকে শুধুমাত্র একা ভগবান শিব নয় অম্বিকাপতি, উমাপতিকেও বন্দনা করা হয়েছে-

নমো হিরণ্যবাহবে হিরণ্যবর্ণায় হিরণ্যরূপায়
হিরণ্যপতয়ে অম্বিকাপতয় উমাপতয়ে
পশুপতয়ে নমো নমঃ।।

"অম্বিকাপতি,উমাপতি, পশুপতি, হিরণ্যাদি সর্বনিধির পালক,তেজোময়, হিরণ্যবাহু, হিরণ্যবর্ণ, হিরণ্যরূপ পরমেশ্বর শিবের উদ্দেশে নমস্কার। "

শুধুমাত্র বেদেই নয়, মহাভারতের অসংখ্য স্থানে শিবমহিমা এবং স্তোত্র আছে। এর মধ্যে অনুশাসন পর্বের ১৭ তম অধ্যায়ে বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক বলা ভগবান শ্রীশিবের সহস্র নামস্তোত্র অন্যতম, এ পবিত্র স্তোত্র সনাতন ধর্মাবলম্বী আমাদের নিত্যপাঠ্য।
সেই স্তোত্রের শুরুতেই ভগবান শিবের মহিমা সম্পর্কে ঋষি তণ্ডী শ্রীকৃষ্ণকে যা বলছেন, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ -

" যিনি তেজেরও তেজ, তপস্যারও তপস্যা, শান্তদিগের মধ্যে অতিশান্ত, সকল প্রভারও প্রভা, জিতেন্দ্রিয়দের মধ্যে যিনি জিতেন্দ্রিয়, জ্ঞানীদের মধ্যে যিনি শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, দেবতাদেরও যিনি দেবতা,ঋষিদের ঋষি, যজ্ঞসমূহের যজ্ঞ, মঙ্গলকারীদের মঙ্গলকারী, রুদ্রগণের রুদ্র, প্রভাবশালীদের প্রভাব, যোগীদের যোগী, সকল কারণের কারণ এবং যাঁর থেকে সমস্তলোক উৎপন্ন হয় আবার যাঁর মধ্যে লয় পায়, সেই সর্বভূতাত্মা, সংহর্তা, অমিততেজা ভগবান মহাদেবের অষ্টোত্তর সহস্রনাম আমার নিকট শুনুন ; হে মনুষ্যশ্রেষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণ, এ মহাপবিত্র স্তোত্র শ্রবনেই আপনি সকল অভীষ্ট লাভ করবেন।
               (শিবসহস্রনামস্তোত্রম : ২৬-৩০)

প্রায় দুইহাজার বছর পূর্বে #মহাকবি_কালিদাস তাঁর জগতনন্দিত #মহাকাব্য_রঘুবংশের শুরুতে প্রথম শ্লোকেই জগতের আদি মাতা-পিতা পার্বতী এবং পরমেশ্বর শিবের বন্দনা করেছেন অসাধারণ আলঙ্কারিক ব্যঞ্জনায়। তিনি বলেছেন - যেমন শব্দ এবং শব্দ থেকে উৎপন্ন  তার অর্থকে আলাদা করা যায় না; ঠিক একইভাবে শিব এবং শক্তিকেও আলাদা করা যায় না। 

বাগর্থাবিব সম্পৃক্তৌ বাগর্থপ্রতিপত্তয়ে।
জগতঃ পিতরৌ বন্দে পার্বতীপরমেশ্বরৌ।।

শব্দ এবং শব্দের অর্থ যেমন করে সম্পৃক্ত ; ঠিক একইভাবে সম্পৃক্ত জগতের আদি পিতা-মাতা শিব এবং পার্বতী। বাগর্থ সহ সকল প্রকার বিদ্যা কলার প্রতিপত্তির জন্যে সেই পার্বতী- পরমেশ্বরকেই সদা বন্দনা করি।

এই একই কথা #শ্রীরামকৃষ্ণ_পরমহংসদেব তাঁর কথামৃতের (শুধু নামেই নয়,  সত্যিকারেই কথামৃত) অসংখ্য স্থানে বিভিন্ন উদাহরণের মাধ্যমে আমাদের বুঝিয়েছেন যে ব্রহ্ম আর তাঁর শক্তি অভেদ। ঠাকুরের ভাষায়-

"... তাই ব্রহ্ম আর শক্তি অভেদ। এককে মানলে, আর একটিকেও মানতে হয়। যেমন অগ্নি আর তার দাহিকা শক্তি ; - অগ্নি মানলেই দাহিকা শক্তি মানতে হয়, দাহিকা শক্তি ছাড়া অগ্নি ভাবা যায় না।...সূর্যেকে বাদ দিয়ে সূর্যের রশ্মি ভাবা যায় না।"

তাই এই এক ব্রহ্ম এবং শক্তিকেই আমরা বিভিন্ন নামে অভিহিত করি- 
* পুরুষ + প্রকৃতি 
* ব্রহ্মা + ব্রহ্মাণী (সরস্বতী)
* বিষ্ণু + বৈষ্ণবী (লক্ষ্মী)
* মহেশ্বর + মাহেশ্বরী (কালী)

তিনি এক কিন্তু রুচির বৈচিত্র্যময়তার জন্যে প্রকাশ অনন্ত।

সনাতন ধর্মানুসারে চিন্তার অতীত পরমেশ্বর যে রূপে সৃষ্টি করেন সেই রূপের নাম ব্রহ্মা, যে রূপে জগৎ পালন করেন সেই রূপের নাম বিষ্ণু এবং যে রূপে লয় বা নাশ করেন সেই রূপের নাম শিব বা মহেশ্বর। এ সহজ  কথাটিই শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথম স্কন্ধের দ্বিতীয় অধ্যায়ে খুব সুন্দর করে দেয়া আছে।

"প্রকৃতির তিনটি গুণ-সত্ত্ব, রজ এবং তম। পরমেশ্বর এক হলেও এই তিনটি গুণের প্রভাবে বিশ্বের সৃষ্টি -স্থিতি-লয়ের জন্যে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর রূপ ধারণ করেন।"

উপাস্য হিসেবে আলাদা আলাদাভাবে উপাসনা করলেও আমরা সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মূলত এক ব্রহ্মেরই অনন্ত রূপ-রূপান্তরের উপাসনা করি। তাই বর্তমানের কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কথায় সংশয়াছন্ন না হয়ে আমরা আমাদের পূর্ববর্তী ঋষি-মুনিদের পথেই সাকার-নিরাকারের সমন্বয়েই অধিকারী ভেদে এক পরমেশ্বরের উপাসনা করতে চাই। অনেকে বলেন, সৃষ্টিকর্তা সাকার হতে পারেন না । আমি তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, সৃষ্টিকর্তা যদি সর্বশক্তিমান হন তবে তিনি সব পারেন, আর যদি না পারেন সেটা তার ব্যর্থতা; তখন তিনি আর সর্বশক্তিমান নন। তাইতো বেদে বলা আছে,-

একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি, অগ্নিং যমং মাতরিশ্বানমাহুঃ।। (ঋগ্বেদ : ০১.১৬৪.৪৬)

"সেই এক পরমেশ্বরকেই আমরা অগ্নি, যম, মাতরিশ্বান সহ বিভিন্ন নামে অভিহিত করি।"

বিভিন্ন নামে এবং রূপে অভিহিত করলেও তিনি বহু নন, তিনি আদতে একজনই। তাই সেই অনন্তরূপে পরিব্যাপ্ত এক ঈশ্বরের করুণায় আমাদের সকলের হৃদয়ে পূর্ণ হয়ে উঠুক এ কামনাই করি।

প্রথম পর্ব লেখক,
শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্ত্তী
সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ, বাংলাদেশ (সভাপতি)।

Post a Comment

0 Comments