বিধবা নারীদের বৈধব্য পালন

বিধবা নারীদের বৈধব্য পালন শ্বেত বসন পড়া ও নিরামিষ ভোজন করা এগুলো কি শাস্ত্র মতে ছিল নাকি তৈরি করা হয়েছিলঃ—



হিন্দু বিধবা নারীদের বৈধব্য পালন শ্বেত বসন পড়া ও নিরামিষ ভোজনরীতি এককালে স্বামীর মৃত্যুর পর কমবয়সী বিধবা নারী তাঁদের বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হত। পতিগৃহে সাধারণভাবে তাঁদের স্থান ছিল না। সিঁথির সিঁদুর মুছে, দেহের সব অলঙ্কার খুলে ফেলে, চুল কেটে, সাদা থান পরে, এক বেলা নিরামিষ খেয়ে অনশন-ক্লিষ্ট অবস্থায় তাঁদের বৈধব্য পালন করতে হত। কারণ ছিল বিধবা নারীর যৌবন, দীর্ঘ কেশ ও রঙিন শাড়ী-গয়নায় পুরুষরা আকৃষ্ট হয় তাই এই ব্যবস্থা। বিধবা নারীর নিজের মধ্যেও যেন কামনার উদ্রেক না হয়, তার জন্য শুধু আমিষ বর্জন নয়, অনেক জায়গাতে মুসুর ডাল, পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি খাওয়ার ব্যাপারেও বাধানিষেধ ছিল, কারণ এগুলি এবং আমিষকে মনে করা হত কামোত্তেজক খাদ্য! বাপের বাড়িতে ভাইদের সংসারেও বিধবাদের স্থান উচ্চে ছিল না। বাড়ির সব কাজ তাঁদের দিয়েই করানো হত। বিধবাদের পুনর্বিবাহ কল্পনা করাও ছিল পাপ। বিধবারা সংসারের কাজ করে শুদ্ধমনে পবিত্র জীবনযাপন করবে এইটেই ছিল সমাজের দাবী। বহু বিধবাকে জোর করে তীর্থক্ষেত্রে রেখে আসা হত। চোখের আড়ালে কাশী, বৃন্দাবন ইত্যাদি জায়গায় তাঁরা কীভাবে জীবন-যাপন করছে সে খবরও কেউ রাখতো না।

নিজেদের তৈরি করা এক মিথ্যাচার প্রথা বংশ পরস্পরা নিয়ম কোন ধর্ম নয়। তা পালন করা, লালন করা বা ধারন করাও ধর্ম নয়। দেখে দেখে শিক্ষা নিয়ে আজ তা বৃদ্ধমূল করে আসছে সনাতনীরা। আকার ধারন করেছে বট বৃক্ষের মতো। যা নারীকে দুর্বল ও শ্রীহীন করেছে। কেড়ে নিয়েছে মনের প্রফুল্লতা। কেড়েছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও। মনে সৃষ্টি করেছে ভয়ের। এ ভয়ই নারীকে রূপান্তরিত করেছে দাসীতে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীর সতন্ত্রতা কেড়েছে কৌশলে।নারী শক্তির ভয়ে ভীত হয়ে জন্ম হতেই করেছে পরাধীন। তাদের হীন মানসিকতার বড় পরিচয় বৈধব্য নীতি সাদা কাপড় পড়িয়ে সামনে রেখে দিয়েছে প্রশ্ন চিহ্ন। না সৃষ্টতে, না প্রলয়ে করেছে কাঠের পুতুল। প্রেমহীন আহারে নিরামিষ তবু পরিমিত যেনো শক্তি হীন হয়ে কামনার অন্ত হয়।

আশার কথা সব বাঁধা পেরিয়ে নারী জেগেছে। যা লক্ষনীয়। এখনো অনেক দূর পাড়ি দিতে হবে। তাই সাহস হারালে চলবে না। নারীকেই নারীর বাঁধা ডিঙ্গাতে হবে। সতন্ত্র হয়ে গৌরবে বাঁচতে হলে সঠিক ও সত্য নিজেকেই জানতে হবে।

সনাতন ধর্মের এক মিথ্যাচার প্রথা আবিষ্কার বিধবাদের বৈধব্য পালন শ্বেত বসন পড়া ও নিরামিষ ভোজন করা।



পবিত্র বেদ এ স্বামীর মৃত্যু হলে বিধবা নারীকে পুনঃ বিবাহ করার স্বীকৃত বা অনুমোদন আছে। অথচ জন্মগুনী নরদেবতা বা দুষ্ট ব্রাহ্মণ্যবাদীরা নিয়মের কারণে বিধবা বিবাহ নিষিদ্ধ করেছিল। পরিশেষে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এসে জন্মগুনীদের ঘাঁড় ধরে বিধবা বিবাহ পুনঃ প্রচলন করেছিলেন। জন্মগুনীদের বংশধরেরা এখনো সাপের মতো ফুস ফুস করছে এসেছে। যেখানে কর্মগুনী যোগ্য ব্রাহ্মনরা সনাতন ধর্মকে রক্ষা করে এসেছে, সেখানে ধীরে ধীরে পদবীধারী জন্মগুনী নামধারী ব্রাহ্মণরা এসে সমাজকে ধ্বংস করে দিয়েছে।


দেখুন পবিত্র বেদে বিধবাদের নিয়ে কি বলা হয়েছেঃ—

সনাতনের সংস্কার সনাতন ধর্মে বিধবা বিবাহ সমর্থন করে পরাশর সংহিতায় ও পবিত্র বেদে বলা হয়েছে—

নষ্ট মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ।
পচস্বাপতসু নারীরাং পতিরন্যো বিধোযতে।।”
(পরাশর স্মৃতি সংহিতা ৪/২৭)

অনুবাদঃ— নারীর যদি স্বামী মারা যায়, তাঁর স্বামী যদি গোপনে সন্ন্যাস গ্রহণ করে নিখোঁজ হয়ে যায়, স্বামী যদি নিখোঁজ হয়ে যায়, স্বামী যদি সন্তান উৎপাদনে অক্ষম হয়, স্বামী যদি অধার্মিক ও অত্যাচারী হয় তবে নারী এই স্বামী ছেড়ে পুনরায় বিবাহ করতে পারে।

(পরাশর স্মৃতি সংহিতা ৪/২৬)
নারীর যদি স্বামী মারা যায়, তাঁর স্বামী যদি গোপনে সন্ন্যাস গ্রহণ করে নিখোঁজ হয়ে যায়, স্বামী যদি নিখোঁজ হয়ে যায়, স্বামী যদি সন্তান উৎপাদনে অক্ষম হয়, স্বামী যদি অধার্মিক ও অত্যাচারী হয় তবে নারী এই স্বামী ছেড়ে পুনরায় বিবাহ করতে পারে।

এখানে আবার যুক্তি আসতে পারে যে বলা হয় স্মৃতিশাস্ত্র তো পরিবর্তিত হয়। তো পরাশর স্মৃতিশাস্ত্র সংহিতার কথা আমরা মানবো কেনো? উপরিউক্ত যুক্তিটি বেশ ভালো, স্মৃতিশাস্ত্রের কথা না মানেন কিন্তু পবিত্র বেদে কথা অবশ্যই মানতে হবে তাই না?

তো দেখুন পবিত্র বেদ এই সম্পর্কে কি বলে পবিত্র বেদে বিধবাদের বিবাহ করা যাবে শাস্ত্র মতেঃ—

ইয়ং নারী পতি লোকং বৃণানা নিপদ্যত উপত্ব্য মর্ন্ত্য প্রেতম্। ধর্মং পুরাণমনু পালয়ন্তী তস্ম্যৈ  প্রজাং দ্রবিণং চেহ ধেহি।। (ঋগ্বেদ ১০.১৮.৭-৮)

পদার্থঃ— মর্ত্য-হে মনুষ্য, ইয়ং নারী-এই স্ত্রী, পতিলোকম-পতিলোককে অর্থাত্ বৈবাহিক অবস্থাকে, বৃণনা-কামনা করিয়া, প্রেতম-মৃত পতির, অনু-পরে, উপ ত্বা-তোমার নিকট, নিপদ্যতে-আসিতেছে, পুরাণম-সনাতন, ধর্ম্মম-ধর্মকে, পালয়ন্তী-পালন করিয়া, তস্য-তাহার জন্য, ইহ-এই লোকে,প্রজাম্-সন্তানকে, দ্রবিণং-এবং ধনকে, ধেহি-ধারন করাও।

অর্থাৎ— হে মনুষ্য! এই স্ত্রী পুনর্বিবাহের আকাঙ্খা করিয়া মৃত পতির পরে তোমার নিকট আসিয়াছে। সে সনাতন ধর্মকে পালন করিয়া যাতে সন্তানাদি এবং সুখভোগ করতে পারে।

এই বিষয়ে একই ভাবে (তৈত্তিরীয় আরন্যক ৬.১.৩) এ বলা হয়েছে—

ইয়ং নারী পতিলোকং বৃণানা নিপদ্যত উপত্বা মর্ত্য
প্রেতম। বিশ্বং পুরাণ মনু পালয়ন্তী তস্যৈ প্রজাং দ্রবিণং চেহ ধেহি।।

“হে মনুষ্য! মৃত পতির এই স্ত্রী তোমার ভার্যা। সে পতিগৃহ
সুখের কামনা করিয়া মৃত পতির পরে তোমাকে প্রাপ্ত
হইয়াছে। কিরুপ ভাবে অনাদি কাল হইতে সম্পূর্ন স্ত্রী
ধর্মকে পালন করিয়া। সেই পত্নীকে তুমি সন্তানাদি এবং
ধনসম্পত্তি সহ সুখ নিশ্চিত কর”

পরের মন্ত্রটি দেখি, (অথর্ববেদ ১৮.৩.২) এই মন্ত্রটি ও (ঋগবেদ ১০.১৮.৮) এ ও আছে—

উদীষর্ব নার্ষ্যভি জীবলোকংগতাসুমেতমুপশেষ এহি।
হস্তাগ্রাভস্য দিধিষোস্তবেদং পত্যুর্জনিত্বমভি সংবভূব।।

অর্থাৎ— হে নারী! মৃত পতির শোকে অচল হয়ে লাভ কি? বাস্তবজীবনে ফিরে এসো। পুনরায় তোমার পাণিগ্রহনকারী পতির সাথে তোমার আবার পত্নীত্ব তৈরী হবে।

অর্থাত্ "বিধবা মহিলাদের উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছে, হে নারী তোমার স্বামী এখন মারা গেছে। তুমি আবার পুনরায় জীবিত পতি গ্রহণ কর, যে তোমার হাত গ্রহণ করবে ও তোমার দায়িত্ব গ্রহণ করবে, তুমি সারা জীবন তোমার এই নতুন পতীর সাথে জীবন সঙ্গী হিসাবে আবদ্ধ হও।

প্রায় একইভাবে তৈত্তিরীয় আরন্যক এ বলা হয়েছে ৬.১.১৪ তে—

"হে নারী! তুমি এই মৃতপতির মায়ায় আবদ্ধ হয়ে আছো।এই মায়াত্যগ কর। পুনরায় পতি কামনা করো এবং পাণিগ্রহনকারী (নতুন পতি) বিবাহের অভিশাষী এই পতিকে জায়াত্বের সহিত প্রাপ্ত হও"

অর্থাত্ এখানে স্বামীমৃত্যুর পর স্ত্রীকে শোকে মুহ্যমান না হতে,শোকত্যাগ করে স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে বলা হয়েছে এবং প্রয়োজনে পুনরায় বিবাহ করার অনুমতি দিয়েছে।

সতীদাহ প্রথা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ইতিহাসঃ—

সনাতন ধর্মের বেদ শাস্ত্রে কোথাও সতীদাহ প্রথার কোন বর্ননা নেই। এই কুপ্রথা কিছু ভন্ড ধর্ম ব্যবসায়ীদের দ্বারা তৈরী এক জঘন্য প্রথা যা তাদের নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য তৈরী করা হয়েছিল। মন্ত্র বিশ্লেষনে দেখা গেল বেদ নারীর পুনরায় বিয়ের ব্যাপরে বলছে। সতীদাহ প্রথার কোন কথাই নেই বরং স্বামীমৃত্যুর পর স্ত্রীকে শোকে মুহ্যমান হয়ে না পড়ে শোকত্যগ করে স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে বলা হয়েছে এবং প্রয়োজনে পুনরায় বিবাহ করার অনুমতি ও দিয়েছে শাস্ত্র। সতীদাহ প্রথা মধ্যযুগে যখন ধর্মব্যবসায়ী ব্রাহ্মণ এবং মুসলমান ও বিদেশীদের চক্রান্তে সনাতন ধর্মালম্বীদের বেদজ্ঞান হয়ে পড়েছিল অতি দুষ্প্রাপ্য তখন সমাজে অনুপ্রবেশ করে সতীদাহ প্রথা নামক ঘৃন্য প্রথা। এছাড়াও বিধবা নারীদেরকেও পুনরায় বিয়ের সুযোগ না থাকায় অনেক নিপীড়িত হতে হয়, তারা যেন ছিল এক বোঝা। তবে রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরদের মত মহান ব্যক্তিত্বরা বেদ এর মাধ্যমে এসব প্রথাকে ভুল প্রমান করেন এবং হিন্দুসমাজ রক্ষা পায় এক কলঙ্কজনক অধ্যায় থেকে। অধুনা কিছু নাস্তিক ও অন্যান্য ধর্মালম্বীদের মধ্যে কিছু কুচক্রী লোক বেদ এর কিছু মন্ত্র এর রেফারেন্স দেয় সতীদাহ প্রথা এর পক্ষে হিসেবে দাবী করেছে তাই এই কাণ্ডকৃতী।

সতীদাহ প্রথা হচ্ছে হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিধবা নারীদের স্বামীর চিতায় সহমরণে বা আত্মহুতি দেবার ঐতিহাসিক এই প্রথা, যা রাজা রামমোহন রায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বন্ধ হয়েছে।

আমাদের আদি ধর্মগ্রন্থ বেদে বলা আছে— এখানে একজন বিধবার দ্বিতীয় বিয়েতে আশীর্বাদ প্রদান করা হয়েছে। বলা হয়েছে হে নারী আবার জাগো। পূর্বের জন এখন প্রানশূন্য। তাই প্রানের পৃথিবী তে ফিরে এসো। যে তোমার হাত পুনঃরায় হাত আঁকড়ে ধরে রেখেছে (দিধিশু = দ্বিতীয় স্বামী) তাকে গ্রহণ কর। তোমরা এক নতুন দাম্পত্য জীবন শুরু করছ। (ঋগবেদ ১০/০/৮)

এখানে বিধবা নারীরা পুনর্বিবাহ বলা আছে। তাঁকে আগুনের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ দিতে কোনোখানে বলা হয়নি। সুতরাং—

১। পবিত্র বেদে— সতীদাহ প্রথার কথা বলা নেই।

২। শ্রীমদ্ভগবত গীতা— গীতার মধ্যে কোন শ্লোক নেই  সতীদাহ সম্পর্কিত কিছু বলা আছে।

৩। মহাভারত— মহাভারতে ১৮ দিন ব্যাপী যুদ্ধে বহু যোদ্ধা মারা যায়। তাদের স্ত্রীরা কিন্তু আগুনে ঝাঁপ দেয়নি।

কেউ যুক্তি দিতে পারে মাদ্রী তো আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিলঃ— মাদ্রী মনে করত তাঁর স্বামীর মৃত্যুর জন্য সে দায়ী। সেই জন্য তাঁর স্বামীর চিতায় ঝাঁপ দেয়। তীব্র অনুশোচনা থেকে তিনি এই কাজ করেছিলেন।

আসলে সতীদাহ কিঃ— সতীদাহ বলে কোন প্রথাই হয় না। যেটা ছিল নাম জওহর প্রথা। এই প্রসঙ্গে রানী পদ্মিনীর কথা জানি যে। শাসক খলজি এবং তাদের সাঙ্গপাঙ্গর হাতে নিজেকে সমর্পণ করবেন না বলে ১৩০০০ জন জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দেয়। স্বামীর মৃত্যুর পরে যাতে কারো দ্বারা ধর্ষিত বা সম্মানহারা না হতে হয় তাই নারীদের প্রতি এই প্রথা বেছে নিয়েছিল। এই ভাবে মুঘল যুগে এই প্রথা ব্যাপক বিস্তৃতি পায় যা পরবর্তীতে ইংরেজ আমলে চলে আসে এবং সেটাকে ইস্যু করে সনাতন ধর্মে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচার শুরু হয়।

ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি

জয় শ্রীরাম
হর হর মহাদেব

       শ্রী বাবলু মালাকার 
(সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ, চট্টগ্রাম)

Post a Comment

0 Comments