শরীরের জীবাত্মা ও পরমাত্মাকে কিভাবে জানা যায়?


ঈশ্বর সর্বব্যপী বিরাজিত তিনি উর্ধ্বে, চারপাশে সর্বদিকে বিদ্যমান সর্বব্যপী স্রষ্টা, যিনি আমাদের মধ্যেও ব্যক্তিত্বরূপে বিদ্যমান। ঈশ্বরই একমাত্র সকল ব্যষ্টিরের সমষ্টি-স্বরূপ; তথাপি তিনি ‘ব্যক্তি-বিশেষ’। যেমন মনুষ্যদেহ একটি বস্তু, ইহার প্রত্যেক কোষ একটি ব্যষ্টি; সমষ্টি—ঈশ্বর, ব্যষ্টি—জীব, সুতরাং দেহ যেমন কোষের উপর নির্ভর করে ঠিক ঈশ্বরের অস্তিত্ব ও তেমনি জীবের অস্তিত্বের উপর নির্ভর করে, এর বিপরীতটিও ঠিক তেমনি এইরূপে জীব ও ঈশ্বর যেন সহ-অবস্থিত দুইটি সত্ত্বা, একটি থাকলে অপরটি থাকবেই।

                জীবাত্মা কিভাবে জানা যায়
  
ওঁ দ্বা সুপর্ণা সযুজা সখায়া সমানং বৃক্ষং পরিষস্বজাতে ।
তয়োরন্যঃ পিপ্পলং স্বাদ্বত্ত্যনশ্নন্নন্যো অভিচাকশীতি ।।
(শ্বেতাশ্বতর, ৪/৬), (মুণ্ডক, ৩/১/১), (ঋগ্বেদ, ১/১৬৪/২০), (অথর্ববেদ, ৯/১৪/২০)।

অনুবাদঃ— সদা একসাথে অবস্থানকারী (তথা) পরস্পর সখ্যভাবযুক্ত দুটি পক্ষী (জীবাত্মা এবং পরমাত্মা) একই বৃক্ষের (শরীরে) আশ্রয় নিয়ে থাকে। উভয়ের মধ্যে একজন (জীবাত্মা) ওই বৃক্ষের (শরীরের) ফলসমূহ (কর্মফল) স্বাদ নিয়ে ভোজন করে, অন্যজন (ঈশ্বর) তার উপভোগ না করে কেবলমাত্র নিরীক্ষণ করেন।

উপরের কথাটা বুঝতে পারলে পরমাত্মাকে অবশ্যই জানতে হবে।

           পরমাত্মাকে কিভাবে জানা যায়?

ওঁ ঋচো অক্ষরে পরমে ব্যোমন্ যস্মিন্ দেবা অধি বিশ্বে নিষেদুঃ ।
যস্তং ন বেদ কিমৃচা করিষ্যতি য ইৎ তদ্ বিদুস্ত ইমে সমাসতে ।।
(শ্বেতাশ্বতর, ৪/৮), (ঋগ্বেদ, ১/১৬৪/৩৯),
(অথর্ববেদ, ৯/১৫/১৮)।

অনুবাদঃ— যাঁর মধ্যে সমস্ত দেবগণ ভালোভাবে স্থিত, সেই অবিনাশী পরব্যোমে সম্পূর্ণ বেদ বিদ্যমান। যে মানুষ তাঁকে জানে না সে ঋচা (বেদের) দ্বারা কি সিদ্ধ করবে? কিন্তু যারা তাঁকে জানে তারা এতে সম্যকরূপে অবস্থিত।

    ভগবান! শরীরের (আত্মা) কেন মরণশীল নয়?

শরীরের এই আত্মা কখনো জন্মগ্রহণ করেও না এবং কখনও মরেও না। ইনি অন্যান্য জাত বস্তুর ন্যায় জন্মিয়া অস্তিত্ব লাভ করেন না অর্থাৎ ইনি সৎরূপে নিত্য বিদ্যমান। ইনি জন্মরহিত, নিত্য, শাশ্বত এবং পুরাণ; শরীর হত হইলেও ইনি হত হন না।

ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ নায়ং ভূত্বাহভবিতা বা ন ভূয়ঃ ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ।।             (গীতা, ২/২০)

অনুবাদঃ— আত্মা কখনো জন্ম হয় না বা মৃত্যু না। তিনি জন্ম-গ্রহণের দ্বারা অস্তিত্ব লাভ করেন না; তিনি জন্মরহিত, শাশ্বত (চিরস্থায়ী), নিত্য (সর্বদা এক ও সৎরূপ) এবং পরিণামশূন্য। শরীর নষ্ট হলেও আত্মা কখনো বিনষ্ট হয় না।
 
       আত্মাকে এটা জানতে পারলে কি হয়?

যিনি আত্মাকে অবিনাশী, নিত্য, অজ, অব্যয় বলিয়া জানেন, সে পুরুষ কি প্রকারে কাহাকে হত্যা করেন।

বেদাবিনাশিনং নিত্যং য এনমজমব্যয়ম্ ।
কথং স পুরুষঃ পার্থ কং ঘাতয়তি হন্তি কম্ ।।
                 (গীতা, ২/২১)

অনুবাদঃ— হে পার্থ! যিনি এ আত্মাকে অবিনাশী, নিত্য, শাশ্বত, জন্ম-রহিত ও অক্ষয় বলে জানেন, তিনি কিভাবে কাউকে হত্যা করতে বা হত্যা করাতে পারেন।

              আত্মার কি মৃত্যু হয়, ভগবান?

মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, আত্মাও ঠিক তেমনি জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করেন।

বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি গৃহ্ণাতি নরোহপরাণি । তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী ।।
                       (গীতা, ২/২২)

অনুবাদঃ—  যেমন মনুষ্য জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করিয়া নতুন বস্ত্র গ্রহণ করে, সেইরূপ আত্মা জীর্ণ শরীর পরিত্যাগ করিয়া অন্য নতুন শরীর পরিগ্রহ করেন।

ঈশ্বরঃ কারণং পুরুষকর্মাফল্যদর্শনাৎ । 
           (ন্যায়সূত্র-৪/১/১৯)

অর্থাৎঃ— কর্মফলমুক্ত পুরুষই ঈশ্বর।

                  শরীরের এই আত্মা কে?

শরীরের এই আত্মা চৈতন্যময় সত্ত্বা যাকে ব্রহ্ম বলা হয়। ওঁ (পরমব্রহ্ম) এই অর্থেই (অউম) জগৎ যাঁর দ্বারা দীপ্ত হয় এই অর্থে ব্রহ্ম। ব্রহ্ম যিনি জগৎ সৃষ্টি ও রক্ষা করে আছেন, তিনি জন্মরহিত, শাশ্বত (চিরস্থায়ী), সর্বদা নিত্য। এই শরীর আত্মা ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয় তিনি এক সত্ত্বাধিকারী পরমব্রহ্ম এই হলো চৈতন্যময় সত্ত্বা আমাদের মাঝে আছেন সার্বক্ষণিক দৃশ্য ও দৃশ্যমান হয়ে সাকার ও নিরাকার হতে বিরাজিত। 

                                 
                    পরমব্রহ্মের রূপ কি?

রূপং রূপং প্রতিরূপো বভুব তদস্য রূপং প্রতিচক্ষণায় ৷
ইন্দ্রো মায়াভিঃ পুরুরূপ ঈয়তে যুক্তা হস্য হরয়াঃ শতা দশ ৷।
                    (ঋগ্বেদ, ৬/৪৭/১৮)

অনুবাদঃ— “রূপে রূপে প্রতিরূপ (তাহার অনুরূপ) হইয়াছেন, সেই ইহার রূপকে প্রতিখ্যাপনের (জ্ঞাপনের) জন্য ইন্দ্র মায়াসমূহের দ্বারা বহুরূপ প্রাপ্ত হন। যুক্ত আছে ইহার অশ্ব শত দশ (অর্থাৎ সহস্র)৷”

পদার্থঃ— (ইন্দ্রঃ) জীবাত্মা (রূপং-রূপং প্রতিরূপ
বভুব) প্রত্যেক প্রানির রূপে তদাকার হয়ে বিরাজমান
হন। (তত্ অস্য রূপং প্রতি চক্ষনায়) তাহা এই রূপে
আধাত্ম দৃষ্টি দ্বারা দেখায় যোগ্য। এই জীবাত্মা (সায়াভি) নানা বুদ্ধি দ্বারাই (পুরু-রূপঃ ইয়তে) নানা রূপের জানা যায়। (অস্য ইহার শাসনে, দেহ মধ্যেই (দশ শতা হরয়ঃ) দশ শত প্রানগন অশ্ব বা ভূত্যের সমান (যুক্তাঃ) যুক্ত জ্ঞান তন্তু তথা শক্তিতন্তু রূপে কাজ করে।

(ওঁ) এই ব্রহ্মাত্মকে একাক্ষর উচ্চারণপূর্বক স্মরণ করতে করতে যিনি দেহ ত্যাগ করে প্রস্থান করেন তিনি পরম গতি প্রাপ্ত হয়

সবাই ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,

ওমিত্যেকাক্ষরং ব্রহ্ম ব্যাহরন্ মামনুস্মরন্ ।
যঃ প্রয়াতি ত্যজন্ দেহং স যাতি পরমাং গতিম্ ।।
                    (গীতা, ৮/১৩)

অনুবাদঃ— যে ব্যক্তি 'ওঁ' এই এক অক্ষররূপে আমাকে চিন্তা করতঃ শরীরকে ত্যাগ করে যায় ব্রহ্মকে উচ্চারণ করতঃ (এবং তার অর্থস্বরূপে) সেই ব্যক্তির পরম গতিকে প্রাপ্ত হয়।

ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি!

জয় শ্রীরাম
জয় শ্রীকৃষ্ণ
হর হর মহাদেব  

                      শ্রী বাবলু মালাকার
                  (সনাতন ধর্মের প্রচারক)

Post a Comment

0 Comments