চন্দ্র সূর্য ও মহাকর্ষ ব্যাখা

সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসার ব্যাখ্যা



বেদে উদ্ধৃত দেবী ঊষা যিঁনি রাতের আধার শেষ করে প্রভাতের আগমন ঘটান। এই ঊষাকাল একটি পরমমুহূর্ত বা অবস্থা যাকে বৈদিক ঋষিগণ দেবী বলে সম্বোধন করেছেন। ঋগ্বেদে সূর্যোদয়ের ৯ মিনিট পূর্বে ঊষাদেবীর আগমনের কথা বলা হয়েছে।

ওঁ সদৃশীরদ্য সদৃশীরিদু শ্বো দীর্ঘং সচন্তে বরুণস্য ধাম।
অনবর্দ্যাস্ত্রিংশতং যোজনান্যেকৈকা ক্রতুং পরিযন্তি সদ্যঃ।।
                    (ঋগ্বেদ, ১/১২৩/৮)

অনুবাদঃ— আজও যেরূপ, আগামীকালও সেইরূপ; দিবারাত্রির আবির্ভাব পর্যায়ক্রমিক ও অবিরত। ঊষা দেবীগণ অনবদ্য বরুণের অবস্থিতিস্থান থেকে প্রতিদিন তারা ত্রিংশৎ যোজন অগ্রে অবস্থিত হন।

সায়ণাচার্যের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এখানে বরুণ অর্থে সূর্য। তাঁর মতে সূর্য প্রতি দণ্ডে (৬০ পল/২৪ মিনিট=১দণ্ড) ৭৯ যোজন অতিক্রম করেন। আর ঊষা সূর্যের ৩০ যোজন পূর্বগামী তাই সূর্যোদয়ের প্রায় ৩/৮ দণ্ড বা ৯ মিনিট পূর্বে ঊষার উদয়। বর্তমান বিজ্ঞান এই সময়কে ৮ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড প্রায় বলে স্বীকার করে। হাজার হাজার বছর আগে বৈদিক ঋষিদের এই হিসাব অতি সূক্ষ্ম ‍ও নির্ভুল। একথা একারণেই বলা যায় যে- বর্তমান বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল, ঋষিবিজ্ঞান পরিবর্তনহীন। এমনকি বর্তমান বিজ্ঞানকে মেনে নিলেও সেইসময়ের ঋষিগণ কোনো অংশে কম নন।

সূর্য সাতটি ঘোড়ার টানা রথে উদিত হয় এবং অস্ত যায় এমনটা কি সম্ভব?

বৈদিক যুগে একই শব্দ একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হত। আজও একই শব্দের একাধিক অর্থ বাংলায় প্রচলিত আছে। বৈদিকযুগে 'গো' শব্দ দ্বারা জল, রশ্মি, বাক্য, পৃথিবী, গরু ইত্যাদি বুঝাত। আবার 'অশ্ব' শব্দ দিয়ে বুঝাত রশ্মি, ঘোড়া। বৈদিক যুগে শুধু জলেরই ১০১টি নাম ছিল। যে মন্ত্র নিয়ে বিভ্রাট সেটা দেখে নেওয়া যাক।

সপ্ত অশ্বযোজিত সূর্যের একচক্ররথে একই অশ্ব সপ্তনামে রথ বহন করছে। চক্রের তিন নাভি (দিবা, রাত্রি, বছর)। এ কখনই শিথিল হয় না। সমস্ত জগৎ একে আশ্রয় করে আছে।
                       (ঋগ্বেদ, ১/১৬৪/২)

এই সপ্তচক্র রথে যে সপ্ত অধিষ্ঠান করে তারাই সপ্ত অশ্ব এবং তারাই এই রথ বহন করে।
                       (ঋগ্বেদ, ১/১৬৪/৩)

এখানে অশ্ব অর্থে কখনই ঘোড়া নয়। উপযুক্ত মন্ত্রে অশ্ব স্থলে রশ্মি পড়লে কোনো অসঙ্গতি থাকে না। কেননা ঋষিরা জানতেন যে একই আলো সাতটি ভাগে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে আর সেকারণে সপ্ত অশ্ব তথা রশ্মির কথা বলা হয়েছে।

ওঁ ত্রিমূর্ধানং সপ্তরশ্মি গৃণীষেহনূনমগ্নিং পিত্রোরুপস্থে।
নিষত্তমস্য চরতো ধ্রুবস্য বিশ্বা দিবো রোচনাপপ্রিবাংসম।।
                        (ঋগ্বেদ, ১/১৪৬/১)

অনুবাদঃ— ত্রিজগতব্যাপীত, সপ্তরশ্মিযুক্ত আলোকদাতা ও বিকলতারহিত অগ্নিকে স্তব কর। সর্বত্রগামী, অবিচলিত, দ্যোতমান এবং অভীষ্টবর্ষী অগ্নির তেজ চতুর্দিকে ব্যাপ্ত হইতেছে।

ওঁ অয়ং দ্যাবাপৃথিবী বি ষ্কপ্রায়দয়ং রথমুষনক সপ্তশ্মি্ম।
অয়ং গোষু শচ্যা পক্কমন্তঃ সোমো দাধার দশয়ন্ত্রমুৎসম্।
                        (ঋগ্বেদ, ৬/৪৪/২৪)

অনুবাদঃ— এ দিব্য শক্তি স্বর্গ ও পৃথিবীকে স্ব স্ব স্থানে সংস্থাপিত করিয়াছে। এ দিব্য শক্তি সূর্যের সপ্ত রশ্মিময় রথ যোজিত করিয়াছে। এ দিব্যশক্তি স্বেচ্ছানুসারে ধেনুগণের মধ্যে পরিণত দুগ্ধের উৎস স্থাপন করিয়াছেন।

এই সপ্তরশ্মি বর্তমান বিজ্ঞানের VIBGYOR (আসহবেনীকলা) এর সঙ্গে তুলনীয়।

পবিত্র বেদে চন্দ্রের আলো স্বকীয় নয় বলে উল্লেখিত হয়েছে।


ওঁ অত্রাহ গোরমন্বত নাম ত্বষ্টুরপীচ্যম্ ।
ইত্থা চন্দ্রমসো গৃহে।
                      (ঋগ্বেদ,১/৮৪/১৫)

অনুবাদঃ— গমনশীল চন্দ্রলোকে সূর্য্যের উজ্জ্বল জ্যোতি প্রতিফলিত হয় -এইরূপ মানা হয়।

একই কথা ঋষি যাস্ক বলেছেনঃ—

তদেতেন উপেক্ষিতব্যং অস্য দীপ্তির্ভবতি।
                       (নিরুক্ত, ২/৬)

অনুবাদঃ— সূর্যকিরণ চন্দ্রে প্রতিফলিত হয়ে চন্দ্রের আলোক হয়। এ কখা ঋগ্বেদের সময় এবং যাস্কের সময়ে আর্য ঋষিদের জানা ছিল।

মহাকর্ষ ও অভিকর্ষ বা মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সম্পর্কে বেদে কী বলা হয়েছে?



আধুনিক বিশ্বে সকলের ধারণা মহাকর্ষ ও অভিকর্ষ শক্তি নিউটন প্রথম আবিষ্কার করেছেন। অনেকেই জানেন না যে, এ বিষয়ে হিন্দুদের মূল ধর্মগ্রন্থ বেদ-এ স্পষ্টভাবে আলোচনা হয়েছে।

ওঁ সবিতা যন্ত্রৈঃ পৃথিবী মরভণাদস্কম্ভনে সবিতা দ্যামদৃংহৎ।
অশ্বমিবাধুক্ষদ্ধু নিমন্তরিক্ষমতূর্তে বদ্ধং সবিতা সমুদ্রম।।
                        (ঋগ্বেদ ১০/১৪৯/১

অনুবাদঃ— সূর্য্য রজ্জুবৎ আকর্ষণ দ্বারা পৃথিবীকে বাঁধিয়া রাখিয়াছে। নিরাধার আকাশে দ্যুলোকের অন্যান্য গ্রহকেও ইহা সুদৃঢ় রাখিয়াছে। অচ্ছেদ্য আকর্ষণ রর্জ্জুতে আবদ্ধ, গর্জনশীল গ্রহসমূহ নিরাধার আকাশে অশ্বের ন্যায় পরিভ্রমণ করিতেছে।

দেখুন, আকাশ যে ‘নিরাধার’ এবং ‘রজ্জুবৎ আকর্ষণ’ অর্থাৎ মহাকর্ষ শক্তির দ্বারাই যে সেই নিরাধার আকাশে সূর্য ও গ্রহসমূহ নিজ অক্ষরেখায় সুদৃঢ় রয়েছে -এখানে সেকথা বলা হয়েছে। বিশ্বের প্রভাবশালী অনেক ধর্মগ্রন্থে আকাশকে স্পষ্টভাবে ‘পৃথিবীর ছাদ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অথচ এই সব ধর্মমতের জন্মেরও হাজার বছর পূর্বে বেদ-এ আর্য ঋষিগণ আকাশকে ‘নিরাধার’ অর্থাৎ পৃথিবীকে ও গ্রহসমূহকে শূন্যে ভাসমান বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। আরও লক্ষ্যণীয়, মহাকর্ষ শক্তিতে আবদ্ধ গ্রহসমূহ যে নিরাধারে অর্থাৎ মহাশূন্যে স্থির নয়, বরং পরিভ্রমণ করছে নিজ কক্ষপথে -এই জ্ঞানও আবিষ্কার করেছিলেন বৈদিক ঋষিগণ। এমনকি সূর্য নিজেও যে তার নিজস্ব কক্ষপথে চলছে সেই অত্যাশ্চর্য গূঢ় বিজ্ঞানও আলোচিত হয়েছে নিম্নের মন্ত্রেঃ—

ওঁ আকৃষ্ণেন রজসা বর্তমানো নিবেশয়ন্নমৃতং মর্তঞ্চ।
হিরণ্ময়েন সবিতা রথেনা দেবো যাতি ভুবনানি পশ্যন্।।                         (ঋগ্বেদ ১/৩৫/২)

অনুবাদঃ— সূর্য্য আকর্ষমাধ্যাকর্ষণ রূপে রথে চড়িয়া যেন সারা লোকান্তর দেখিতে দেখিতে গমন করিতেছে।

খুব অবাক হতে হয়, পৃথিবী যেমন চাঁদকে সঙ্গে নিয়ে সূর্যের চারপাশে প্রদক্ষিণ করছে, তদ্রূপ সূর্যও যে তার গ্রহ-উপগ্রহসমূহকে সঙ্গে নিয়ে নিজের কক্ষপথে গমন করছে -এই গভীর জ্ঞানও পবিত্র বেদ-এ আলোচিত হয়েছে।

          শ্রী বাবলু মালাকার
  (সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ, চট্টগ্রাম)   

Post a Comment

0 Comments